আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে বাড়ির ভেতরে একটি খুঁটির সঙ্গে গলায় লোহার শিকল দিয়ে মহিলাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল। অভিযোগ, তাঁর স্বামী একটি লাল-গরম লোহার রড দিয়ে স্ত্রীর শরীরে ছ্যাঁকা দেন, বারবার মারধর করেন এবং পুলিশের কাছে যাওয়ার জন্য উস্কানি দেন।
শুক্রবার রাতে সেই মহিলাই মধ্যপ্রদেশের রাজগড় জেলার একটি থানায় গিয়ে হাজির হন ক্লান্ত ও ক্ষতবিক্ষত শরীরে, রক্তাক্ত পায়ে। অবশ্য, মহিলার গলায় তখনও লোহার শিকলটি ঝোলানো ছিল। এই শিকল বেঁধেই তাঁকে বন্দি করে রেখেছিলেন তাঁর স্বামী।
শেষপর্যন্ত অবশ্য নির্যাতিতার মহিলার স্বামী সর্দার সিং তানওয়ারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কীভাবে পুলিশের কাছে গেলেন নির্যাতিতা?
নির্যাতিতা মাঙ্গিবাঈ তানওয়ার পুলিশকে জানান, ১০ জুন সন্ধ্যায় তাঁর স্বামী মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফেরার পরই নির্যাতনের সূত্রপাত হয়।
রাতের খাবারের পর স্বামী তাঁকে গালিগালাজ করতে শুরু করেন। মাঙ্গিবাঈ প্রতিবাদ করলে স্বামী বাইরে গিয়ে গাছের একটি ডাল কেটে লাঠি তৈরি করেন। এরপরই শুরু হয় নৃশংস মারধর।
লাঠি দিয়ে মাঙ্গিবাঈ তানওয়ারকে পেটানো হয়। বারবার চড় মারা হয় এবং হুমকি দেওয়া হয়। এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মাঙ্গিবাঈ পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে খিলচিপুর থানার দিকে এগিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই একটি মন্দিরের কাছে তাঁর স্বামী তাঁকে ধরে ফেলেন। ফের মারধর করেন এবং জোর করে গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যান।
বাড়ি ফেরার পর তাঁর ওপর নেমে আসে আরও অকথ্য অত্যাচার। মাঙ্গিবাঈ অভিযোগ করেন যে, তাঁর স্বামী তাঁর গলায় একটি লোহার শিকল পেঁচিয়ে সেটির অন্য প্রান্ত একটি খুঁটির সঙ্গে আটকে তালা দিয়ে দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামী তখন তাঁকে বলেন, "এবার দেখি কীভাবে তুমি থানায় গিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করো।"
গরম লোহার রড দিয়ে ছ্যাঁকা
ওই মহিলা অভিযোগ করেন যে, এরপর তাঁর স্বামী গ্যাস স্টোভে একটি লোহার রড গরম করে তাঁর শরীরে চেপে ধরেন। তিনি জানান, তাঁর কোমর, নিতম্ব এবং ডান উরুতে ওই গরম রডের ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছিল। ব্যথায় তিনি চিৎকার করে উঠলেও সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি।
পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা মাঙ্গিবাঈকে বাড়ির ভেতরেই আটকে রাখা হয়। তাঁকে বাইরে যেতে বা কারও সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাঙ্গিবাঈ-এর স্বামী একই সঙ্গে পঞ্চায়েত ডাকার জন্য গ্রামবাসীদের জড়ো করার চেষ্টা করছিলেন এবং পুলিশের কাছে যাওয়ার পরিকল্পনা ত্যাগ করার জন্য তাঁকে চাপ দিচ্ছিলেন। তখন আরও হিংসা, অত্যাচরের আশঙ্কায় মহিলা রাজি হওয়ার ভান করেন।
আসলে, তিনি পালানোর সুযোগ খুঁজছিলেন।
যে পাথরটি তাঁকে মুক্তি দিল
স্বামী প্রস্তাবিত পঞ্চায়েতের জন্য গ্রামবাসীদের ডাকতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলেন। এই সুযোগই কাজে লাগান মহিলা। মাঙ্গিবাঈয়ের নজর পড়ে একটি পাথর। তখন তিনি পাথরটি তুলে শেকল বাঁধা তালায় আঘাত করতে শুরু করলেন। একবার। দুবার। বারবার। তালাটি ভাঙছিল না।
তবে তিনি আঘাত করতেই থাকন। বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর অবশেষে তালাটি ভেঙে যায়। শিকল খুলে যায়। ফলে তাঁর বন্দিদশার অবসান হয়।
এক মুহূর্তও নষ্ট না করে মাঙ্গিবাঈ তানওয়ার দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে খিলচিপুরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
অন্ধকারের মধ্য দিয়ে ছয় কিলোমিটার পথ
ততক্ষণে রাত নেমে এসেছিল। মাঙ্গিবাঈ নির্জন এলাকা, মাঠ এবং এবড়োখেবড়ো পথের মধ্য দিয়ে হাঁটতে থাকেন। তাঁর গলায় অবশ্য তখনও ভাঙা শিকল ও তালা ঝুলছিল। কাঁটা তাঁর পায়ে বিঁধছিল। যাত্রাপথে তাঁর পা ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। তবুও তিনি এগিয়ে চলেন।
পথের ধারে থাকা মানুষজন তাঁর গলার শিকল দেখে ভেবেছিল মাঙ্গিবাঈ তানওয়ার হয়তো মানসিক ভারসাম্যহীন। খুব কম মানুষই প্রশ্ন করার জন্য দাঁড়িয়েছিল। আর তার চেয়েও কম মানুষ বুঝতে পারে যে, ওই শিকল আসলে কীসের প্রতীক। তবে একজন পথচারী তাঁর দুর্দশা লক্ষ্য করে তাঁকে কিছু খেতে দেন। তবে তাঁর থানা দিকে হেঁটে চলা থামেনি।
পুলিশ হতবাক
রাত ১০টা নাগাদ মাঙ্গিবাঈ যখন খিলচিপুর থানায় ঢোকেন, তখন অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মীরাও হতবাক হয়ে যান। লোহার শিকলটি তখনও তাঁর গলায় ঝুলছিল। মহিলার শরীরে পোড়া দাগ স্পষ্ট ছিল। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
থানায় পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন এবং ঘটে যাওয়া সব ঘটনা খুলে বললেন। পুলিশ শিকলটি খুলে ফেলে এবং তাঁকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য পাঠায়।
পুলিশ জানিয়েছে, পরীক্ষায় মাঙ্গিবাঈ-এর শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও পোড়া ক্ষতের দাগ পাওয়া গিয়েছে। তখনই গ্রামে একটি দল পাঠানো হয় এবং অভিযুক্ত স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্বামী গ্রেপ্তার
খিলচিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এসএইচও) কমল সিং গেহলট জানান, ওই মহিলা পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন যে তাঁর স্বামী তাঁকে মারধর ও বেআইনিভাবে আটকে রেখেছিলেন। তিনি বলেন, "মহিলার অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁকে আদালতে হাজির করা হচ্ছে।"
পুলিশের তথ্যমতে, বাড়িতে কথা-কাটাকাটির জেরে বিবাদের সূত্রপাত হয় এবং পরে তা হিংসার রূপ নেয়। তদন্তকারীরা ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখছেন।
যে শিকল দিয়ে একসময় তাঁর কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই শিকলটিই তিনি থানায় নিয়ে যান, আর তা-ই হয়ে ওঠে তাঁর ওপর নির্যাতনকারী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ।















