আজকাল ওয়েবডেস্ক: তৃণমূল থেকে বেরিয়ে ২০ 'বিদ্রোহী' সাংসদ ত্রিপুরা-ভিত্তিক স্বল্প-পরিচিত দল 'ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া' (এনসিপিআই)-র সঙ্গে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রবিবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে এই 'বিদ্রোহী' সাংসদরা বৈঠক করেন। তার পরেই, ওই ২০ জন সাংসদের মধ্যে ১৯ জন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার বাসভবনে গিয়ে দেখা করেন। এই সাংসদরা অধ্যক্ষের কাছে একটি চিঠি জমা দেন। জানান যে, তাঁরা এনসিপিআই-র সঙ্গে মিশে যাবেন এবং অদূর ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন এনডিএ-কে সমর্থন করবেন। তাঁরা 'ইন্ডিয়া' জোটের সদস্যদের থেকে আলাদা বসার ব্যবস্থাও দাবি করেন।

এই পদক্ষেপ জাতীয় স্তরের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। এনসিপিআই-এর সমর্থনের ফলে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ সংখ্যার বিচারে লাভবান হবে। কারণ তারা এনডিএ সংসদে গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশ করানোর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

একনজরে আগামী পরিস্থিতি-

বর্ষাকালীন অধিবেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিল পেশের বিষয়ে এনডিএ-র পরিকল্পনা
সংসদের মাসব্যাপী বর্ষাকালীন অধিবেশন ২১ জুলাই শুরু হবে। এনডিএ সরকার গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংশোধনী বিল পেশ করার লক্ষ্য নিয়েছে এবং এর জন্য তাদের দুই-তৃতীয়াংশ আইনপ্রণেতার সমর্থনের প্রয়োজন হবে।

পাঁচটি রাজ্যের নির্বাচনের আগে সরকার ১৩১তম সাংবিধানিক সংশোধনী বিল পেশ করেছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা। এই বিষয়টি নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা 'ডিলিমিটেশন' প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে বিলটি বড় বাধার মুখে পড়ে। কারণ ২৯৮ জন সাংসদ এই বিলের পক্ষে এবং ২৩৮ জন বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ফলে লোকসভায় বিলটি পরাজিত হয়।

তখন থেকেই ব্যাপকভাবে জল্পনা চলছে যে, এনডিএ এমন বেশ কিছু দলের সাংসদদের সমর্থন চাইবে যাঁরা ক্ষমতাসীন জোটের অংশ নয়। তামিলনাড়ুতে কংগ্রেস ও ডিএমকে-র মধ্যে দূরত্ব তৈরির পর এমন জল্পনাও জোরদার হয়েছে যে, আগামী দিনে এনডিএ হয়তো ডিএমকে-র কাছ থেকে নির্দিষ্ট কোনও ইস্যুতে সমর্থন চাইতে পারে।

তৃণমূলের সংসদীয় দলে ভাঙন এবং দলের ২০ জন সাংসদের প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার ফলে, আসন্ন সংসদীয় অধিবেশন সূচনার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরুর আগেই বিজেপি এক বিশেষ কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

তৃণমূলে ভাঙন ধরাতে বিজেপির ভূমিকা
তৃণমূলের এই ভাঙন বা বিভাজনের নেপথ্যে বিজেপির ভূমিকা নিয়ে তীব্র জল্পনা উস্কে দিয়েছে। পর্যবেক্ষকরা এক্ষেত্রে বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোর দিকে ইঙ্গিত করছেন। পাশাপাশি, ওই বৈঠকগুলোতে নিশিকান্ত দুবে, সিএম রমেশ এবং শুভেন্দু অধিকারীর মতো বিজেপি নেতাদের উপস্থিতি এই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে যে, কেন্দ্র ও রাজ্য - উভয় স্তরের শাসকদলই এই ভাঙন প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা পালন করেছে।

মমতা ব্যানার্জির অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুদীপ ব্যানার্জি, যিনি শনিবারই 'বিদ্রোহী' সাংসদদের তালিকায় স্বাক্ষর করেছিলেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকও করেন।

তবে, তৃণণূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা ভাঙন প্রক্রিয়ায় কোনও ধরনের ভূমিকার কথা বিজেপি নেতারা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন বিধায়কদের একটি অংশ প্রথম মমতা ও অভিষেক ব্যানার্জির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল, তখনই শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন যে- এই পরিস্থিতির সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই।

দলীয় সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়ার প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
এই সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কারণ বিজেপি এবং 'বিদ্রোহী' সাংসদ, উভয় পক্ষের মধ্যেই এক ধরণের রাজনৈতিক উদ্বেগ কাজ করছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির অনেক নেতার আশঙ্কা, যেসব রাজনীতিকের বিরুদ্ধে তাঁরা বছরের পর বছর ধরে লড়াই করেছেন, তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুললে দলের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে। অন্যদিকে, 'বিদ্রোহী' সাংসদদের মধ্যেও নিজস্ব উদ্বেগ রয়েছে। তাঁরা জানেন যে, তাঁদের আইনি যুক্তি যদি ধোপে না টেকে, তবে লোকসভার সদস্যপদ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

এছাড়া, সুদীপ ব্যানার্জির অন্তর্ভুক্তি পুরো ঘটনাপ্রবাহে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাপস রায় (বর্তমানে শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভার সদস্য) এবং সজল ঘোষের মতো তৃণমূল-র প্রাক্তন প্রভাবশালী নেতারা সুদীপের সঙ্গে কাজ করা কঠিন মনে করেই দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাপস রায় একাধিকবার প্রকাশ্যে সুদীপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এমনকি সম্প্রতি একটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও, 'বিদ্রোহী' সাংসদদের তালিকায় স্বাক্ষর করার পর সুদীপকে 'সুবিধাবাদী' বলে সমালোচনা করেছেন তাপস রায়।

আগামী দিনে 'বিদ্রোহী' সাংসদদের আইনি চ্যালেঞ্জেরও মুখে পড়তে হতে পারে। তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি লোকসভার অদ্যক্ষের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে 'সুভাষ দেশাই বনাম মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল' মামলায় সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, আইনসভার শাখার (সংসদীয় দলের) ওপর মূল রাজনৈতিক দলেরই প্রাধান্য থাকে। এবং একটি বৈধ সংযুক্তি তখনই স্বীকৃত হতে পারে যখন মূল রাজনৈতিক দলটি নিজেই অন্য কোনও সংগঠনের সঙ্গে মিশে যায়। চিঠিতে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, শুধুমাত্র সাংসদদের একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী কোনও সংযুক্তির বৈধতা প্রমাণ করতে পারে না।

বিশিষ্ট আইনজীবী কপিল সিবালও একইভাবে 'বিদ্রোহী' আইনপ্রণেতাদের আইনি অবস্থানের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মূল সংগঠনের সম্মতি ছাড়া অন্য কোনও দলে যোগ দেওয়া সংশ্লিষ্ট সাংসদদের পদ খারিজের পথ সুগম করছে।

অধ্যক্ষ ওম বিড়লার ওপর দায়িত্ব
বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এই গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ভাগ্য এখন লোকসভার অদ্যক্ষ ওম বিড়লার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তৃণমূল নেতৃত্ব এবং 'বিদ্রোহী' গোষ্ঠী- উভয়ের কাছ থেকেই আনুষ্ঠানিক আবেদন পাওয়ার পর, অধ্যক্ষকে এখন দু'টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রথমত, ২০ জন সাংসদের এনসিপিআই -তে অভ্যন্তরীণ সংযুক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কি না। দ্বিতীয়ত, ট্রেজারি বেঞ্চের (সরকারি দলের আসন) অংশ হিসেবে তাঁদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হবে কি না।

সাংবিধানিক গুরুত্ব এবং এর সঙ্গে জড়িত নজিরের কথা বিবেচনা করলে, অধ্যক্ষেরর কার্যালয় থেকে নেওয়া কোনও সিদ্ধান্তই যে শেষ কথা হবে, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং, এর ফলে আদালতে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র আইনি লড়াই শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এনসিপিআই
এই দলটি বাংলার অধিকাংশ মানুষের কাছেই অপরিচিত। তবে বর্তমানে এই দলই জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

সমাজকর্মী এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর কর্মী সুজিত দে হলেন এনসিপিআই-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সংযুক্তি বা দলবদলের খবরটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই তিনি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে এক টেলিফোন কথোপকথনে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সুজিত দে বলেন, "ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনের সময় আমাদের দল তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালো লড়াই করেছিল।" উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গত বিধানসভা নির্বাচনে দলত্যাগীদের অন্তর্ভুক্ত করার বিরুদ্ধেও দলটি সক্রিয়ভাবে প্রচার চালিয়েছিল।