আজকাল ওয়েবডেস্ক: একটি সোনার চেন, মাত্র একটি সোনার চেনের লোভ কেড়ে নিল ২৩ বছরের এক তরতাজা তরুণীর প্রাণ। যে বাড়িতে কয়েক দিন আগেও বিয়ের সানাই বাজছিল, সেখানে এখন শুধুই কান্নার রোল। বিহারের বাসিন্দা সঞ্জু কুমারীর বিয়ে ধুমধাম করে হয়েছিল বিনোদ পালের সঙ্গে। গত ৩০ এপ্রিল তিলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়, এরপর গায়ে হলুদ এবং ৭ মে চার হাত এক হয়। পাত্রীপক্ষের পরিবার তাঁদের সাধ্যের বাইরে গিয়ে ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। জামাইকে খুশি করতে নগদ ৪ লক্ষ টাকা, মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, প্রেসার কুকার, আসবাবপত্র, কাঁসা-পিতলের বাসনপত্র এবং সোনা-রুপোর গয়না— কিছুই বাকি রাখেননি সঞ্জুর বাবা-মা। কিন্তু লোভের তো কোনও  শেষ নেই। বরপক্ষের নজর আটকে ছিল একটি সোনার চেনে। আর সেই চেনের দাবিতেই বিয়ের মাত্র চার দিনের মাথায় প্রাণ হারাতে হল নতুন বউকে।

সঞ্জুর ভাই শিবম পালের বয়ান অনুযায়ী, বিয়ের দিনই পাত্রপক্ষ আচমকা একটি সোনার চেনের দাবি বসে। সেই সময় সঞ্জুর পরিবার প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা পরে চেনের ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু এই আশ্বাসে মন গলেনি বিনোদ ও তার পরিবারের। বিয়ের পর থেকেই সঞ্জুর কপালে জুটতে থাকে চরম লাঞ্ছনা ও কটূক্তি। শাশুড়ি, শ্বশুর, ননদ ও নন্দাই মিলে তাঁর ওপর মানসিক অত্যাচার শুরু করে, আর সুরাট ফেরত স্বামী বিনোদ চালাত শারীরিক নির্যাতন। সঞ্জুকে বাপের বাড়ির লোকের সঙ্গে যোগাযোগ পর্যন্ত করতে দেওয়া হতো না। লুকিয়ে ফোন করলেই জুটত অমানুষিক মারধর। এরই মধ্যে কোনওমতে একদিন দাদাকে ফোন করে কান্নায় ভেঙে পড়ে সঞ্জু বলেছিলেন, "ভাইয়া, এরা আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। এখানে আমার একটুও ভালো লাগছে না।" মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এবং পরিস্থিতি থিতু হবে এই আশায় বুক বেঁধেছিল বাপের বাড়ির লোক। আগামী ১৩ মে সঞ্জুর বাপের বাড়ি ফেরার কথা ছিল, কিন্তু তার আগেই ১১ মে সব শেষ হয়ে গেল।

মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তের সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে শিউরে উঠছেন শিবম। সঞ্জুর বাড়ি ফেরার বিষয়ে কথা বলতে তিনি জামাইবাবু বিনোদকে ফোন করেছিলেন। সেই সময় হঠাৎই ফোনটি কেড়ে নেন বিনোদের মা সুমিত্রা দেবী এবং চিৎকার করে বলেন, "তোমার বোন আর বেঁচে ফিরবে না, এবার তার লাশই বাড়ি যাবে।" ফোনের ওপার থেকে তখন ভেসে আসছিল সঞ্জুর শেষ আর্তনাদ, আর তার পরেই ফোনটা কেটে যায়। পরিবারের অভিযোগ, সঞ্জুকে শ্বাসরোধ করে খুন করার পর সব প্রমাণ লোপাট করতে তড়িঘড়ি শ্মশানে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গ্রামের কিছু মানুষের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ যখন শিবমকে জানায়, ততক্ষণে সব শেষ। ১২ মে শ্মশানে পৌঁছে শিবম দেখেন বোনের শরীরের সিংহভাগই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, পড়ে আছে শুধু মাথার খুলি আর পায়ের কিছু অংশ। সঞ্জুর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখা যায় দরজায় ঝুলছে তালা। ঘটনার পর থেকেই স্বামী বিনোদ ও তার পরিবারের বাকি সদস্যরা পলাতক।

গ্রামের মানুষ জানাচ্ছেন, সঞ্জু অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র মেয়ে ছিলেন। স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শেষ করে তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার, যাতে অভাবের সংসারে বাবা-মাকে একটু সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন গোড়াতেই এভাবে পিষে দেওয়া হল। ঘটনার তদন্তে নেমে জগদীশপুর থানার পুলিশ এবং ফরেনসিক দল শ্মশান ও ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক সুশান্ত কুমার মণ্ডল জানিয়েছেন, শিবমের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে স্বামী বিনোদ, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ ও নন্দাইয়ের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই শাশুড়ি সুমিত্রা দেবীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জেরায় অবশ্য সুমিত্রা দেবীর দাবি, সোনার চেন নিয়ে অশান্তির জেরে সঞ্জু নাকি নিজেই আত্মঘাতী হয়েছেন। তবে পুলিশ একে খুন এবং আত্মহত্যা— দুই কোণ থেকেই খতিয়ে দেখছে। বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে এলাকায় নাগাড়ে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন।