'দয়া আজকাল বিরল, ঘৃণাই বেশি বিক্রি হয়'- এমনই তীব্র অথচ আবেগমাখা বার্তা দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ পোস্ট করলেন অভিনেতা অমর্ত্য ঘোষাল। তাঁর অভিনীত সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি 'নেভারমাইন্ড'-কে ঘিরে চলা ট্রোলিং, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং বিদ্বেষের জবাব দিয়েই কার্যত নিজের মনের দরজা খুলে দিলেন তিনি।

নিজের পরিচয় দিয়ে অমর্ত্য লেখেন, তিনি একজন কর্মরত অভিনেতা, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (এফটিআইআই)-এর প্রাক্তনী, স্বাধীন সঙ্গীতশিল্পী এবং অভিনেত্রী চৈতি ঘোষাল-এর ছেলে। বর্তমানে তাঁর প্রেক্ষাগৃহে চতুর্থ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি 'নেভারমাইন্ড' বাংলার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে চলছে। গত এক মাস ধরে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, চৈতি ঘোষাল, রূপম ইসলাম-সহ ছবির অন্যান্য শিল্পী ও কলাকুশলীদের সঙ্গে তিনি ছবির প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন।

এই প্রচারের সময়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে ঘিরে শুরু হয়েছে একের পর এক কটাক্ষ, বিদ্রুপ এবং ট্রোলিং। সেই প্রসঙ্গ টেনে অমর্ত্য লেখেন, অনেকেই হয়তো ক্ষুব্ধ যে তিনি একটি ছবিতে অভিনয় করেছেন, নিজের সর্বস্ব দিয়ে ছবির প্রচার করেছেন এবং দর্শকদের কাছ থেকে আন্তরিক ভালবাসা পেয়েছেন। আবার কারও কারও আপত্তি তাঁর পোশাক নিয়েও। তাঁর কথায়, বিদ্বেষ ছড়ানো, মহিলাদের অপমান করা কিংবা লিঙ্গ, বয়স ও শারীরিক গঠন নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করা আজকাল অনেক বেশি জনপ্রিয়। কারণ সেগুলোতেই নাকি বেশি ভিউ, বেশি পৌঁছনো, বেশি অর্থ।

অমর্ত্য স্পষ্ট জানিয়েছেন, 'নেভারমাইন্ড'-এর আগে তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কখনও খুব বেশি প্রকাশ্যে আসেননি। তাই অনেকের মনে হতে পারে, এই ছবির মাধ্যমেই তিনি হঠাৎ সামনে এসেছেন। কিন্তু বাস্তবটা একেবারেই আলাদা। তাঁর প্রথম ছবি ছিল 'উড়নচণ্ডী'। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি পর্দার সামনে ও পিছনে সমান নিষ্ঠায় কাজ করে চলেছেন।

পোস্টে তিনি তুলে ধরেছেন 'নেভারমাইন্ড'-এর নেপথ্যের কঠোর পরিশ্রমের কথাও। পরিচালনা, পোস্ট-প্রোডাকশন থেকে শুরু করে নানা সাংগঠনিক কাজে অসংখ্য রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন বলেও জানান তিনি। তাঁর দাবি, দর্শক হয়তো সেই পরিশ্রম দেখেন না। তাঁরা জানেন না, কী নিষ্ঠা নিয়ে এই ছবি তৈরি হয়েছে কিংবা প্রিমিয়ার ও বিভিন্ন শো-তে ছবিটি দেখে কত মানুষ আবেগে ভেঙে পড়েছেন।

 

 

ট্রোলিংয়ের মাত্রা যে কতটা ব্যক্তিগত হয়েছে, সেটাও খোলাখুলি লিখেছেন অমর্ত্য। তাঁর পোশাকের জন্য তাঁকে 'হিজড়া' বা 'গে' বলে কটাক্ষ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, এই শব্দগুলিকে তিনি কোনও অপমান বলেই মনে করেন না। বরং তাঁর মতে, সেই সম্প্রদায়ের মানুষের পোশাকবোধ ও সৃজনশীলতা অনেকের চেয়েই বেশি সমৃদ্ধ। একই সঙ্গে সহ-অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত-কেও অকল্পনীয় মাত্রায় বডি শেমিংয়ের শিকার হতে হয়েছে বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।

এরপরেই আসে তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রসঙ্গ। অমর্ত্য লেখেন, দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এফটিআইআই-এ পড়াশোনা করার অর্থ কী, তা অনেকেই জানেন না। সেখানে সারা দেশ থেকে মাত্র কয়েকটি সাধারণ আসনের জন্য প্রতিযোগিতা হয়। সেই শিক্ষা তাঁকে শুধু সিনেমা নয়, মানুষ ও সমাজকে নতুন করে চিনতে শিখিয়েছে। তথ্যচিত্র নির্মাণ, সাধারণ মানুষের গল্প বলা এবং সেই কাজ নিয়ে ইউরোপে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তবে তাঁর আক্ষেপ, এসব অর্জন কখনও শিরোনাম হয় না, কারণ এগুলোতে 'ভিউ' মেলে না।

একইসঙ্গে তিনি জানান, অজয় দেবগণ-এর সঙ্গে প্রায় ২৫০ কোটির বাজেটের একটি ছবিতে অডিশন পেরিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগও পেয়েছেন। কিন্তু এসব সাফল্য নিয়ে তিনি কখনও বাড়তি প্রচার করেননি।

তবে অমর্ত্যের কথায়, 'নেভারমাইন্ড' কোনও ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি ছবি নয়। এটি ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, চৈতি ঘোষাল কিংবা তাঁকে নিয়েও নয়। এই ছবি আসলে কলকাতা এবং এখানকার মানুষকে নিয়েই। তাঁর দাবি, প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে বহু দর্শক আবেগে ভেঙে পড়ছেন। আর সেই কারণেই তাঁর প্রশ্ন— কলকাতা কবে থেকে এমন শহরে পরিণত হল, যেখানে সুস্থ সমালোচনার বদলে বিদ্বেষ, ট্রোলিং আর কুৎসাই প্রধান হয়ে উঠল? সিনেমা নিয়ে গভীর আলোচনা, লেখালিখি কোথায় হারিয়ে গেল? কেন এখন সবকিছুই পাপারাজ্জি ভিডিও আর ট্রোল কনটেন্টে সীমাবদ্ধ?

পোস্টের শেষ অংশে ট্রোলদের উদ্দেশে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন অমর্ত্য। তিনি লেখেন, হয়তো তাঁর অস্তিত্বই অনেকের মধ্যে রাগ, হতাশা আর ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। তার জন্য তিনি দুঃখিত। কিন্তু থেমে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। ভালবেসে সিনেমাকে বেছে নিয়েছেন, কারও অনুমতি নিয়ে নয়। তাই সিনেমা বানানোও তিনি বন্ধ করবেন না।

সবশেষে শিল্প, সংলাপ এবং সহমর্মিতায় বিশ্বাসী মানুষদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, 'আবার দেখা হবে সিনেমা হলে। বারবার। ততদিন... নেভারমাইন্ড।'

পাশাপাশি যারা ব্যক্তিগত বার্তা, ফোন, শুভেচ্ছা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন অমর্ত্য। তাঁর কথায়, এই সহমর্মিতার ঋণ তিনি কোনওদিন ভুলবেন না।