গত জানুয়ারিতেই সুখবরটা এসেছিল। দীর্ঘ চার দশকের অনবদ্য অভিনয়জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হতে চলেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। বাংলা বিনোদন জগতের ইতিহাসে যাঁর নাম শুধুই একটি অভিনেতার নয়, বরং একটি সময়ের, একটি ধারার, একটি নিরবচ্ছিন্ন যাত্রার প্রতীক। তাঁর এই সম্মান যেন গোটা ইন্ডাস্ট্রিরই গর্ব।

শিশুশিল্পী হিসেবে পথচলা শুরু হলেও নয়ের দশকে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পরই টালিগঞ্জের বাণিজ্যিক ছবির মুখ হয়ে ওঠেন প্রসেনজিৎ। রোমান্টিক হিরো থেকে অ্যাকশন তারকা, পারিবারিক ছবির নির্ভরযোগ্য মুখ থেকে সমাজ-মনস্ক ও চরিত্রনির্ভর সিনেমার শক্ত ভিত- সব জায়গাতেই সমান সাবলীল তিনি। শুধু বাংলা নয়, হিন্দি ছবিতেও নিজের দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবে নতুন প্রতিভাকে জায়গা করে দিয়ে, টেলিভিশন ও ওয়েব সিরিজে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে বারবার নতুন করে গড়ে তুলেছেন।

এই সম্মান প্রাপ্তির আনন্দ শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি প্রসেনজিৎ। তাঁর ছেলে তৃষাণজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং প্রযোজক শ্রীকান্ত মোহতার উদ্যোগে রবিবার রাতে টলি-তারকাদের বাসভবন ‘উৎসব’-এ আয়োজন করা হয়েছিল এক রাজকীয় উদযাপনের। আর সেই রাতেই এক ছাদের তলায় জড়ো হয়েছিল টালিগঞ্জের প্রায় গোটা পরিবার।

রবিবার সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামতেই শীতের হালকা ছোঁয়া মেখে একে একে উৎসব-এর চৌকাঠ পেরোলেন ইন্ডাস্ট্রির তারকারা। উপস্থিত ছিলেন প্রসেনজিতের বড়পর্দার সবচেয়ে সফল জুটিদার ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। ছিলেন চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী, অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, লাবণী সরকার। হাজির দেব, শুভশ্রী, জিতু কামাল। অয়ন চক্রবর্তী, ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকদের সঙ্গে দেখা গিয়েছে মিমি চক্রবর্তী, ইমন চক্রবর্তী, গৌরব-দেবলীনা, রণজয় বিষ্ণু, সৌমিতৃষা কুণ্ডুদেরও। তালিকাটা যেন থামতেই চাইছিল না, কারণ সবাই এসেছিলেন তাঁদের ইন্ডাস্ট্রির অভিভাবক-সম অভিনেতার আনন্দ ভাগ করে নিতে।

কেমন ছিল সেই রাত? উৎসব-এর অন্দরের পরিবেশ কি শুধুই ঝলমলে আলোয় উজ্জ্বল, না কি আবেগের উষ্ণতায় শীতের শিরশিরে হাওয়া হার মানছিল? তার খানিকটা ঝলক মিলেছে সমাজমাধ্যমে।

‘কালরাত্রি’ সিরিজের পরিচালক অয়ন চক্রবর্তী ফেসবুকে লিখেছেন,“পদ্মশ্রী প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সম্মান পাওয়া উদযাপনের আয়োজন হয়েছিল বুম্বাদার বালিগঞ্জ ফাঁড়ির বাড়িতে। আয়োজক শ্রীকান্ত মোহতা আর তৃষাণজিৎ চট্টোপাধ্যায়। গিয়ে দেখলাম, যথারীতি প্রসেনজিৎ বাড়িতে নেই, বাড়ি দখল করে আছে বুম্বাদা। ঢুকেই আদর করে বলল, ‘হয়তো খুব একটা দেখাশোনা করতে পারব না আজ, নিজের মতো করে মজা কর।’ অথচ পরের সাড়ে তিন ঘণ্টায় বার পাঁচেক দেখে গেছে সব ঠিকঠাক চলছে কি না। বেরোনোর সময় হাত ধরে বলল, ‘খেয়েছিস তো? সাবধানে বাড়ি যা।’
এই হল সেই কুইন্টিসেনশিয়াল বাঙালি ভদ্রলোক, যাঁরা আজকাল বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি।”

অসুস্থ শরীর নিয়েও হাজির ছিলেন পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়ও ।তিনিও নিজের আবেগ লুকোননি। তিনি লেখেন,“পদ্মশ্রী প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ওনাকে সম্মান জানাতে ভাল লাগে। আগুন পাখির মতো নিজের শিল্পীসত্তার পুনরুদ্ভাবনের গল্পে অনুপ্রাণিত হতে ভালো লাগে। এতটা পথ পেরিয়েও সিনেমা নিয়ে ওঁর কমিটমেন্ট দেখে নতুন গল্প ভাবতে ইচ্ছে করে।”
কথাশেষে মজার ছলে তাঁর সংযোজন, “ ‘সপ্তডিঙ্গার গুপ্তধন’-এর শুটিংয়ের প্রথম দিনেই সিঁড়ি থেকে পড়ে লিগামেন্ট টিয়ার, তবু বুম্বাদার পাশে ক্রাচ হাতে দাঁড়িয়ে কাকাবাবুর প্রমোশন করতে ভাল লাগে।”

অন্যদিকে শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় দু’টি হাসিমুখের ছবি পোস্ট করে ছোট্ট করেই লিখেছেন, “আমাদের গর্ব।” ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হাসিমুখে শুভশ্রীকে জড়িয়ে ধরেছেন বুম্বাদা, আর অভিনেত্রীর কাঁধে স্নেহের ভরসার হাত প্রসেনজিতের।

 

&t=313s

 

একটি সম্মান, একটি রাত, কিন্তু তার রেশ যেন অনেক গভীরে। পদ্মশ্রী প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের এই উদযাপন আসলে শুধুই একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়। এটি টালিগঞ্জের সম্মিলিত গর্ব, ভালবাসা আর দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দলিল।