আজকাল ওয়েবডেস্ক: নিউইয়র্কের মিডটাউন ম্যানহাটনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক রুজভেল্ট হোটেলকে ঘিরে বড়সড় পরিকল্পনা করেছে পাকিস্তান সরকার। বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা এই শতাব্দীপ্রাচীন হোটেলের মূল্য ইসলামাবাদ ধরতে চাইছে কমপক্ষে এক বিলিয়ন ডলার। তবে সম্পত্তিটি পুরোপুরি বিক্রি নয়,পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক ডেভেলপারদের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বের পথেই হাঁটতে চায় পাকিস্তান।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আইএমএফ-সমর্থিত সাত বিলিয়ন ডলারের বেসরকারিকরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রুজভেল্ট হোটেলে কিছুটা অংশীদারি ছাড়তে রাজি হয়েছে পাকিস্তান সরকার। এক শীর্ষ সরকারি আধিকারিক জানিয়েছেন, নিউইয়র্কে পাকিস্তানের মালিকানাধীন বিদেশি সম্পত্তিগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। তাঁর দাবি, বিশ্বের বড় বড় ডেভেলপারদের আগ্রহ “অত্যন্ত বেশি” এবং পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে এই সম্পত্তির বাজারমূল্য এক বিলিয়ন ডলারের অনেক ওপরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

১৯২৪ সালে উদ্বোধন হওয়া রুজভেল্ট হোটেল অবস্থিত ৪৫ ইস্ট ৪৫তম স্ট্রিটে, ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ের কোণে। গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল টার্মিনাল, ফিফথ অ্যাভিনিউ ও টাইমস স্কয়ার থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ নিউইয়র্ক রিয়েল এস্টেটের ভাষায়, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান খুব কমই আছে। সক্রিয় রেললাইনের ওপর নির্মিত এই বিউ-আর্টস ঘরানার হোটেলটি একসময় আধুনিক বিলাসিতার প্রতীক ছিল। হাজারের বেশি রাম, রাজকীয় স্যুইট, এমনকি শিশু পরিচর্যা ও নিজস্ব চিকিৎসকের সুবিধাও ছিল এখানে।

পাকিস্তানের সঙ্গে রুজভেল্টের সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের বিনিয়োগ শাখা PIA ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড তখন হোটেলটি লিজ নেয় এবং নির্দিষ্ট দামে ভবিষ্যতে কেনার অধিকার পায়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ১৯৯৮ সালে মাত্র ৩৬.৫ মিলিয়ন ডলারে হোটেলটি কিনে নেয় PIA যা আজকের ম্যানহাটনের দামে প্রায় অবিশ্বাস্য। ২০০০ সালের মধ্যে পাকিস্তান সম্পূর্ণ মালিকানা নিশ্চিত করে।

দশকের পর দশক রুজভেল্ট ছিল রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বিনোদনের কেন্দ্র। নিউইয়র্কের গভর্নরদের নির্বাচন-রাতের সদর দপ্তর থেকে শুরু করে হলিউড সিনেমার শুটিং, সবই হয়েছে এই হোটেলে। ‘ওয়াল স্ট্রিট’, ‘দ্য ফ্রেঞ্চ কানেকশন’, ‘মেইড ইন ম্যানহাটান’-এর মতো ছবিতে দেখা গেছে রুজভেল্টকে। তবে ২০২০ সালে কোভিড মহামারির ধাক্কায় পর্যটন শিল্প ভেঙে পড়লে হোটেলটি বন্ধ হয়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্ক সিটি সরকার ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভবনটি বিদেশী নাগরিকদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। এতে সাময়িক আয় হলেও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। ২০২৬ সালের শুরুতে সেই অধ্যায় শেষ হয় এবং ভবনটি আবার খালি হয়ে পড়ে।

পাকিস্তান সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই ভবনকে আবার হোটেল হিসেবে চালানো তাদের লক্ষ্য নয়। প্রায় শতবর্ষ পুরোনো কাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেশি এবং আধুনিক বিলাসবহুল হোটেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কঠিন। তাই জমির প্রকৃত মূল্য কাজে লাগাতে ৪২ হাজার বর্গফুটের এই জায়গায় ৫০ থেকে ৬০ তলা আধুনিক অফিস ও আবাসিক টাওয়ার গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে মোট বিনিয়োগ তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা।

অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি এবং আইএমএফের কড়াকড়ি শর্তের মধ্যে পড়ে বিদেশে থাকা মূল্যবান সম্পদ থেকে অর্থ তোলাই পাকিস্তানের কৌশল। রুজভেল্ট হোটেল এখন আর শুধু অতীতের গৌরব নয়, বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক রসদের উৎস। ম্যানহাটনের এই জমি পাকিস্তানের কাছে আজ ইতিহাসের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কঠিন সময়ে প্রতিটি ডলারই দেশের জন্য অমূল্য।