আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প, বিশেষ করে মহিলা-কেন্দ্রিক প্রকল্পগুলি ভারতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে জয়ের ট্রামকার্ড। এবার সেই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেল বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের দু'টি প্রধান দল, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর (জামাত) নির্বাচনী ইশতেহারে মহিলাদের জন্য নগদ অর্থ স্থানান্তর, সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতিগুলি বড় করে তুলে ধরা হয়েছে। এইসব প্রতিশ্রুতিগুলোর সঙ্গে ভারতের 'আয়ুষ্মান ভারত' এবং 'লড়কি বাহিনী যোজনা'র মতো প্রকল্পগুলির মিল রয়েছে। বাংলাদেশের এবারের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই অবহে বিভিন্ন 'খয়রাতি' প্রকল্পের হাত ধরেই নির্বাচনী বৈচরণী পারে মরিয়া বিএনপি-জামাত।
ইন্ডিয়া টুডের একটি বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে যে, ভারতে বাস্তবায়িত প্রকল্পের মতো কমপক্ষে ছয়'টি প্রকল্প বাংলাদেশের বিঅনপি ও জামাতের নির্বাচনী ইশতেহারে স্থান পেয়েছে। তবে দুই দলের নেতাদের বক্তব্য সেই সব খয়রাতির প্রতিশ্রুতি আসলে বাংলাদেশের নিজস্ব যোজনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই নয়, জামাত তাদের 'জনগণের ইশতেহার' নথিতে ভারতের ছবিও ব্যবহার করেছে বলে চর্চা। সেইসব ছবিতে কলকাতা-ভিত্তিক একজন আলোকচিত্রীর আপলোড করা ছবি এবং ২০১৭ সালের উত্তরপ্রদেশ সরকারের শিশুশ্রম সংক্রান্ত প্রতিবেদনের ছবিও রয়েছে।
জামাত-ই-ইসলামি কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে?
জামাতের ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতিগুলি সবচেয়ে বেশি স্থান পেয়েছে তার মধ্যে রয়েছে একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং দরিদ্রদের জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা।
এটা ভারতের 'আয়ুষ্মান ভারত' প্রকল্পের প্রতিফলন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। ভারত সরকারের এই স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে সরকারি এবং তালিকাভুক্ত বেসরকারি উভয় হাসপাতালে প্রতি পরিবার প্রতি বছর ৫ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্য কভার পেয়ে থাকেন। এই প্রকল্পকে মূলত ভারতের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ, প্রায় ৫৫ কোটি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
জামাত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য 'প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা'র মতো সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন প্রকল্পের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, ভারতের সকল রাজনৈতিক দলের মহিলা-কেন্দ্রিক প্রকল্পগুলি একটি জনপ্রিয় নির্বাচনী বিজয় কৌশল হয়ে উঠেছে। জামাত এবং বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে মহিলাদের সুবিধা দেওয়ার সংকল্প বেশি বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশে ভোটার তালিকায় পুরুষদের চেয়ে মহিলার সংখ্যা বেশি, এই বিষয়টি কেউই ভুলে যায়নি। তবে, গত তিন দশক ধরে হাসিনা এবং খালেদ জিয়ার মতো পোক্ত নেতা শাসিত একটি দেশে এবার মাত্র ৪ শতাংশ মহিলা প্রার্থী।
এদিকে, জামাত ক্ষমতায় এলে তাদের মন্ত্রিসভায় "উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মহিলা" অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যদিও তারা কোনও মহিলা প্রার্থী দেয়নি। এই দল মাতৃত্বকালীন মহিলাদের কাজের সময় পাঁচ ঘন্টা কমিয়ে আনারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অতীতের মহিলা-বিদ্বেষী নীতি এবং মহিলা-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে জামাতের এই মহিলা-কেন্দ্রীয় প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদেরও অবাক করেছে।
বিএনপি কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে?
মহিলাদের জন্য কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি বিএনপির ইশতেহারের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষ করে ঢাকায় ফিরে আসা খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান একটি 'ফ্যামিলি কার্ড'-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এর মাধ্যমে মহিলারা প্রায় ২০০০ টাকা নগদ দেবে। এছাড়াও চাল, ডাল, রান্নার তেল এবং নুনের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীও পেতে পারেন।
এই কর্মসূচিতে প্রাথমিকভাবে ৫০ লক্ষ মহিলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিশেষভাবে নজরে রয়েছেন নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো।
মহিলাদের জন্য এই ধরনের সরাসরি নগদ সহায়তা রাজ্য নির্বাচনে একটি বিজয়ী সূত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তা সে মধ্যপ্রদেশের 'লাডলি বাহনা যোজনা' হোক বা মহারাষ্ট্রের 'লাডকি বাহিন যোজনা'। বাংলাদেশের পূর্ববর্তী নির্বাচনে এই ধরনের মহিলা-কেন্দ্রিক প্রকল্পগুলি খুব একটা আগে দেখা যায়নি।
তাছাড়া, ভারতের মহিলা সমৃদ্ধি যোজনার মতো, বিএনপি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণীর মহিলাদের জন্য একটি ক্ষুদ্র-অর্থায়ন প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটা দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং আয় বৃদ্ধির উপর জোর দেবে।
ভারতের 'কিষাণ ক্রেডিট কার্ড'-এর মতো, বিএনপি'কৃষক কার্ড' ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভারতের এই প্রকল্পের মতো, বাংলাদেশের কৃষক কার্ড-ও সাশ্রয়ী মূল্যের এবং নমনীয় ঋণের পাশাপাশি ভর্তুকি এবং কৃষি বিমা প্রদান করবে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে, বিএনপি ভারতের 'মধ্যাহ্নভোজ' কর্মসূচিতে মুগ্ধ বলে মনে হচ্ছে। ভারতের ১১.২ লক্ষ সরকারি ও সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে প্রতিদিন ১১.৮ কোটিরও বেশি শিশুকে তাজা রান্না করা মধ্যাহ্নভোজ (মিড ডে মিল) সরবরাহ করা হয়। বিএনপি ক্ষমতায় এলে এই ধরণের প্রকল্প চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ভারতে, মহিলা ও দরিদ্রদের লক্ষ্য করে এই ধরণের কল্যাণমূলক প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনে একটি নির্ধারক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা দেখে বিএনপি ও জামাতও উদবুদ্ধ। এখন দেখার ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশি ভোটাররা রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতিতে প্রভাবিত হয় কিনা।
