অভিনেতা রাজপাল যাদবকে ঘিরে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা অবশেষে চরম পরিণতির দিকে গেল। দিল্লি হাইকোর্ট শেষ মুহূর্তে সময় চেয়ে করা তাঁর আবেদন খারিজ করার পর, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তিহাড় জেলে আত্মসমর্পণ করেন রাজপাল যাদব। আদালতের নির্দেশ অমান্য এবং বারবার শর্ত ভঙ্গের প্রেক্ষিতেই তাঁকে ছ’মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে চলা এই চেক বাউন্স ও ঋণ সংক্রান্ত মামলায় আদালতের পর্যবেক্ষণ, অভিযুক্ত একাধিকবার সুযোগ পেয়েও নির্দেশ মানেননি।
2
10
এই আইনি জটিলতার সূত্রপাত ২০১০ সালে। নিজের পরিচালিত প্রথম ছবি ‘আতা পাতা লাপাতা’-র অর্থ জোগাড় করতে এম এস মুরালি প্রজেক্টস প্রাইভেট লিমিটেড থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন রাজপাল যাদব। কিন্তু বক্স অফিসে ছবিটি মুখ থুবড়ে পড়ায় বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন অভিনেতা-পরিচালক।
3
10
ছবির ব্যর্থতার পর ঋণ শোধ করতে কার্যত অসুবিধায় পড়েন রাজপাল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুদ, জরিমানা ও বার বার দেরি করার কারণে সেই ঋণের অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি টাকায়।
4
10
বকেয়া মেটানোর জন্য রাজপাল যাদব একাধিক চেক ইস্যু করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু সেই সব চেক বাউন্স হওয়ায় নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু হয়। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে এক ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রাজপাল যাদব ও তাঁর স্ত্রীকে একাধিক চেক বাউন্স মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ছ’মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। ২০১৯ সালে সেশনস কোর্ট সেই রায় বহাল রাখে, যার পর মামলাটি পৌঁছয় দিল্লি হাইকোর্টে।
5
10
বছরের পর বছর ধরে আদালতের তরফে তাঁকে কিস্তিতে টাকা শোধ করার একাধিক সুযোগ দেওয়া হয়। যদিও রাজপাল আংশিক অর্থ জমা দেন এবং বারবার আশ্বাস দেন, তবু নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পুরো টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, সাতটি পৃথক মামলায় তাঁকে প্রতিটিতে ১ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার নির্দেশ ছিল। পাশাপাশি রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে জমা থাকা অর্থ অভিযোগকারীর হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।
6
10
২০২৫ সালের অক্টোবরে ৭৫ লক্ষ টাকার দুটি ডিমান্ড ড্রাফট জমা পড়লেও আদালত জানায়, এখনও প্রায় ৯ কোটি টাকা বকেয়া রয়ে গেছে।২০২৪ সালের জুন মাসে দিল্লি হাইকোর্ট সাময়িকভাবে রাজপাল যাদবের সাজা স্থগিত রেখেছিল। শর্ত ছিল, তিনি যদি আন্তরিক ও বাস্তবসম্মত উপায়ে মীমাংসার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরবর্তীতে আদালত জানায়, সেই প্রচেষ্টা কোনও অর্থপূর্ণ ফলাফল পাওয়া যায়নি।
7
10
এরপর ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দিল্লি হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়, ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টার মধ্যে তাঁকে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, রাজপাল যাদবের আচরণ বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের উদাহরণ এবং তা নিন্দনীয়।
8
10
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাজপাল যাদব স্বশরীরে আদালতে হাজির হন। তাঁর আইনজীবী জানান, তিনি ২৫ লক্ষ টাকার একটি ডিমান্ড ড্রাফট জমা দিতে প্রস্তুত এবং নতুন করে কিস্তির সময়সূচি মানতে রাজি। কিন্তু বিচারপতি সেই আবেদন গ্রহণ করেননি। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, সহানুভূতির সঙ্গে শৃঙ্খলার ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি এবং চলচ্চিত্র জগতের কাউকে আলাদা সুবিধা দেওয়ার কোনও ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ তৈরি করা যায় না।সেই দিনই রাজপাল যাদব তিহাড় জেলে আত্মসমর্পণ করেন এবং ছ’মাসের জেলের সাজা ভোগ শুরু করেন। জেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সমস্ত নিয়ম মেনেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
9
10
আইনি লড়াইয়ের মাঝে রাজপাল যাদব নিজেও নিজের অসহায়তার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “কী করব? টাকা নেই শোধ করার মতো। আর কোনও রাস্তা দেখতে পাচ্ছি না।” পাশাপাশি তিনি এটাও জানান, ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই এই সময়ে পাশে দাঁড়াননি। তাঁর কথায়, “এখানে সবাই নিজের নিজের মতো।”
10
10
তবে রাজপালের জেলে যাওয়ার পরই মানবিকতার ছবি ধরা পড়ে বলিউডে। অভিনেতা সোনু সুদ প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, তিনি রাজপাল যাদবকে একটি ছবিতে কাজের সুযোগ দেবেন এবং সাইনিং অ্যামাউন্টও দেবেন। পরিচালক অনিস বাজমি ও অভিনেতা গুরমিত চৌধুরীও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের কথায়, “এই ইন্ডাস্ট্রি একটা পরিবার। পরিবার কখনও নিজের মানুষকে ফেলে দেয় না।”