বলিউডে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত পরিচালক। কিন্তু কেরিয়ারের একেবারে শুরুর দিনগুলো মোটেও মসৃণ ছিল না। প্রথম ছবি বানাতে গিয়েই এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যা আজও মনে পড়লে শিউরে ওঠেন পরিচালক তিগমাংশু ধুলিয়া। তাঁর দাবি, নিজের প্রথম ছবি ‘হাসিল’-এর শুটিং করতে গিয়ে নিজের শহরেই তাঁকে শুনতে হয়েছিল ভয়ঙ্কর হুমকি। তিগমাংশুকে মুখে কালি মেখে গাধার পিঠে বসিয়ে শহর ঘোরানোর হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল! শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে দেন জয়া বচ্চন!
২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হাসিল’ উত্তরপ্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এক তীব্র বাস্তবধর্মী ছবি। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ইরফান খান, আশুতোষ রানা ও জিমি শেরগিল। মুক্তির পর সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল ছবিটি। কিন্তু সেই ছবির শুটিংয়ের সময়েই তৈরি হয়েছিল তুমুল বিতর্ক।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা স্মরণ করে ধুলিয়া জানান, সমস্যার সূত্রপাত হয়েছিল ছবির প্রথম দৃশ্য শুট করার সময় থেকেই। সেই দৃশ্যে আশুতোষ রানা-র চরিত্রের প্রবেশ দেখানো হয়েছিল। ছবিতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতার ভূমিকায় ছিলেন। পরিচালক বলেন, গল্পে যেমন নায়ক থাকে, তেমনই খলনায়কও থাকে। কিন্তু যেহেতু প্রথমেই ‘খলনায়ক’-এর দৃশ্য শুট হয়েছিল, অনেকেই ধরে নেন তিনি নাকি বিশ্ববিদ্যালয়কে খারাপভাবে তুলে ধরছেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে চরিত্রের নাম ঘিরে। বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রনেতার নাম ছিল লক্ষ্মীশঙ্কর ওঝা। ছবিতে প্রথমে আশুতোষ রানা-র চরিত্রের নাম রাখা হয়েছিল ‘লক্ষ্মীশঙ্কর পাণ্ডে’। এই মিল নিয়েই শুরু হয় সন্দেহ। পরিচালক জানান, হঠাৎই ফোন আসে। এরপর তাঁকে বলা হয়, “আপনি আমাদের নিয়েই ছবি বানাচ্ছেন।”
এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিচালককে ডেকে পাঠানো হয় জেলা শাসকের দপ্তরে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেতাদের একটি বড় দল। ধুলিয়ার কথায়, প্রায় ২০-২৫ জন তাঁকে ঘিরে ফেলেছিলেন এবং শুরু হয় লাগাতার হুমকি।পরিচালকের কথায়, তাঁকে বলা হয়েছিল, যাত্রী হোটেলের কাচ ভেঙে দেওয়া হবে, হোটেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হবে। এমনকী তাঁর মুখে কালি মেখে গাধার পিঠে বসিয়ে শহরজুড়ে ঘোরানো হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
ঘটনার সময়টি ছিল ২০০১ সাল। তখন তিনি নতুন পরিচালক, প্রথম ছবির শুটিং নিয়ে প্রবল উত্তেজনা ছিল। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। ধুলিয়া জানান, নিজের শহরে দাঁড়িয়ে এমন অপমান সহ্য করতে হবে, তা কল্পনাও করেননি। তিনি নিজেও ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলেন।
পরে অবশ্য তিনি বুঝতে পারেন, পুরো বিষয়টির পিছনে স্থানীয় রাজনৈতিক টানাপোড়েন বড় ভূমিকা নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন জয়া বচ্চন। তাঁর উদ্যোগেই প্রভাবশালী নেতা অমর সিং বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন এবং উত্তেজনা প্রশমিত হয়।
এই ঘটনার পর ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করতে বাধ্য হন পরিচালক। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ছবিতে শহরের নাম আর উল্লেখ করা হবে না। সেই কারণেই ‘হাসিল’ ছবিতে কোথাও সরাসরি এলাহাবাদের নাম শোনা যায় না। মজার বিষয়, ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ইরফান খান-কে প্রথমে ভাবেননি ধুলিয়া। প্রথম প্রস্তাব গিয়েছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনোজ বাজপেয়ী-র কাছে। কিন্তু ‘খলনায়ক’-ঘেঁষা চরিত্রে অভিনয় করতে তিনি রাজি হননি। এরপরই সেই চরিত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইরফান খান-কে।
শুটিং শুরুর কয়েকদিন আগে তাঁকে এলাহাবাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানকার মানুষজনের সঙ্গে মিশে, পরিবেশ বুঝে খুব দ্রুতই চরিত্রটিকে নিজের মতো করে গড়ে তোলেন ইরফান। পরবর্তীতে সেই অভিনয়ই হয়ে ওঠে ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর একটি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসিল শুধু একটি সফল ছবি হিসেবেই নয়, বরং হিন্দি সিনেমায় বাস্তবধর্মী রাজনৈতিক গল্প বলার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেও জায়গা করে নেয়। আর একই সঙ্গে এই ছবিই অভিনেতা ইরফান খান-এর অভিনয়জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
