বলিউডের ইতিহাসে এমন অনেক গল্প আছে যা সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। তেমনই এক বিষাদময় অথচ রহস্যময় নাম রাজ কিরণ। ‘কর্জ’ বা ‘অর্থ’-এর মতো কালজয়ী ছবিতে যাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে, গত দুই দশক ধরে তিনি কোথায়—তা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য।

সুভাষ ঘাইয়ের ‘কর্জ’ ছবিতে ঋষি কাপুরের গত জন্মের অবতার সেই প্রাণবন্ত যুবক কিংবা মহেশ ভাটের ‘অর্থ’ ছবিতে শাবানা আজমির পাশে দাঁড়ানো সেই সংবেদনশীল মানুষটি— রাজ কিরণের মুখের সঙ্গে পরিচয় নেই এমন হিন্দি সিনেমাপ্রেমী খুঁজে পাওয়া দায়। কিন্তু নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তাঁর জীবন যে মোড় নেয়, তা আজও বলিউডের অন্যতম বড় রহস্য হয়ে রয়েছে।

 

সাফল্য থেকে নিঃসঙ্গতা
১৯৭৫ সালে ‘কাগজ কি নাও’ দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা রাজ কিরণ আটের  দশকে নিজেকে একজন নির্ভরযোগ্য অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু নয়ের দশকের শুরুতে তাঁর কেরিয়ারে ভাঁটা পড়তে শুরু করে। বড়পর্দার নায়ক থেকে তিনি ক্রমশ পার্শ্বচরিত্রে সরে যান। এরপরই শুরু হয় তাঁর জীবনের কঠিন অধ্যায়।

 

কারাবাস ও মানসিক লড়াই
১৯৯৬ সালে এক অদ্ভুত ঘটনায় সংবাদ শিরোনামে আসেন রাজ কিরণ। বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল জেলে প্রায় এক মাস বন্দি থাকতে হয় তাঁকে। অভিযোগ ছিল, রাতের অন্ধকারে ট্রাক্টর ও মই নিয়ে তিনি পুত্তপর্তি সাই বাবা আশ্রমে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই অভিজ্ঞতাকে ‘বর্ণনাতীত আতঙ্ক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

পরিচালক মহেশ ভাট একবার জানিয়েছিলেন, মুম্বইয়ের এক হাসপাতালের মানসিক বিভাগে রাজের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই রাজ ছিলেন সম্পূর্ণ অচেনা— বিষণ্ণ এবং প্রাণহীন। ভাট আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “একবার কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ বলে পরিচিতি পেয়ে গেলে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁকে কেউ কাজ দিতে চায় না।”

 

 

 

আটলান্টা না নিউ ইয়র্ক -কোথায় তিনি? ধোঁয়াশা কাটেনি আজও

২০০০ সালের শুরুর দিকে রাজ কিরণ যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ভাই গোবিন্দর কাছে চলে যান। সেখান থেকেই শুরু হয় আসল রহস্য। ২০১১ সালে অভিনেতা ঋষি কাপুর জানিয়েছিলেন যে, রাজ কিরণের ভাই তাঁকে বলেছেন রাজ আটলান্টার একটি মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। এমনকী অভিনেত্রী দীপ্তি নাভালও জনসমক্ষে আবেদন জানিয়েছিলেন রাজকে খুঁজে পেতে সাহায্য করার জন্য, কারণ শোনা গিয়েছিল তিনি নিউ ইয়র্কে ট্যাক্সি চালাচ্ছেন।

তবে রাজের মেয়ে ঋষিকা এই দাবিগুলো নাকচ করে দেন। তিনি জানান, তাঁর বাবা আটলান্টার কোনও প্রতিষ্ঠানে নেই। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:

২০০৩ সালের পর থেকে রাজ কিরণকে আর দেখা যায়নি।

নিউ ইয়র্ক পুলিশ এবং ব্যক্তিগত গোয়েন্দা নিয়োগ করেও তাঁর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

রাজের শেষ লোকেশন ছিল নিউ ইয়র্ক।

২০ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা

দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে, কিন্তু রাজ কিরণ জীবিত না মৃত, কিংবা পৃথিবীর কোনও প্রান্তে তিনি সাধারণ জীবনযাপন করছেন কি না— তা আজও অজানাই রয়ে গেছে। পর্দার সেই পরিচিত মুখটি আজ কেবলই এক রহস্যময় স্মৃতির নাম।