কেমন হল শ্যামৌপ্তি মুদলি এবং গৌরব রায়চৌধুরীর ওটিটি-অভিষেক? ‘রঙ্কিনী ভবন’ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
জমিদার বাড়ি, বনেদি পরিবারের অন্দরে পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে হরেক রকম গল্প। তার কোনওটা বংশের ইতিহাস ঘিরে, কোনওটার কেন্দ্রে পারিবারিক প্রথা। কোনওটা আবার বাড়ির ঘেরাটোপের আলোআঁধারিতে লুকিয়ে থাকা গোপন সত্যি কিংবা কেচ্ছার কিসসা। ইদানীং বাংলা ওটিটি দুনিয়ায় বড়দিনের কেকের মতোই হট হেভারিট এমনই সব গল্প। যাকে ঘিরে বোনা থাকে রহস্যের জাল। এবারের বড়দিনেও তাই এমনই এক কাহিনি নিয়ে হাজির জি ফাইভের নতুন সিরিজ ‘রঙ্কিনী ভবন’। অভ্রজিৎ সেনের পরিচালনায় এই সিরিজের হাত ধরেই ওটিটি পর্দায় অভিষেক ঘটল শ্যামৌপ্তি মুদলি এবং গৌরব রায়চৌধুরীর।
চেনা পরিসরে হেঁটেছে গল্প। ক্লাইম্যাক্স কোন দিকে এগোবে, তা-ও হয়তো আন্দাজ করতে পারবেন থ্রিলার-প্রেমী দর্শকদের কেউ কেউ। চেনা ছক, তবু সাসপেন্স-সাইলজিক্যাল থ্রিলারের হাত ধরাধরিতে গা ছমছমে রহস্যের মৌতাত জমাটি স্বাদে সাজিয়ে দিতে পেরেছেন পরিচালক এবং কাহিনিকার মেঘাতিথি ব্যানার্জি। সেখানেই বড়দিনের আমেজে খাপে খাপ বসে গিয়েছে তার রোমাঞ্চ।
গল্পের শুরুতে সদ্য বিয়ে সেরে পুরুলিয়ার এক গ্রামে শ্বশুরবাড়ি রঙ্কিনী ভবনে গিয়ে পৌঁছয় যূথিকা ওরফে জুঁই (শ্যামৌপ্তি)। লাহিড়ী বাড়ির ছোট ছেলে আদিত্যনাথের (গৌরব) স্ত্রী হিসেবে বাড়িতে পা রাখার মুহূর্তেই প্রাণ হারান যূথিকার শ্বশুর সোমনাথ। এই মৃত্যুর জন্য তাকেই অপয়া বলে দেগে দিয়ে ভাসুর (অনিরুদ্ধ গুপ্ত) এবং ননদের (তনিকা বসু) দুর্ব্যবহার সত্ত্বেও যূথিকাকে আগলে রাখেন তার শাশুড়ি পদ্মাবতী (বিদীপ্তা চক্রবর্তী) এবং স্বামী। অতর্কিতে আসা শোকের ধাক্কা সামলে ওঠার পথেই একটু একটু করে যূথিকা জানতে পারে এ বাড়ির কূলদেবী রঙ্কিনীদেবীর অভিশাপে এবং অনাচারের কারণে অতীতে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এ বাড়ির তিন ছেলের তিন বৌ- কমলিনী (ঈশানী সেনগুপ্ত), বল্লরী (আভেরী সিংহরায়) এবং সিন্ধুজার। এসবের মধ্যেই ফের বিপর্যয়। এবারে অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে তার মেজো ভাসুরের। সন্দেহ দানা বাঁধে যূথিকার মনে। সে সাহায্য চায় নিজের ছোটবেলার বন্ধু, স্থানীয় থানার ইনস্পেক্টর মানসের (সুহোত্র মুখোপাধ্যায়)। সত্যিই কি দেবীর অভিশাপে এই মৃত্যুমিছিল, নাকি বাড়িতেই কেউ রয়েছে এর নেপথ্যে? যূথিকা-মানসের হাত ধরে সেই রহস্যভেদের পথ ধরেই এগিয়েছে গল্প। আর তাতেই আঞ্চলিক সমাজ-সংস্কৃতির ছোঁয়ায় এক অন্য রকম স্বাদ-গন্ধের আমেজ এনে দিয়েছে সমান্তরালে বয়ে চলা এক স্থানীয় পরিবারের কাহিনি এবং পুরুলিয়ার ছৌ নাচের অনুষঙ্গ। তাদের সঙ্গে কীভাবে জুড়ে আছে লাহিড়ী পরিবার, সে উত্তর রাখা সিরিজের কাহিনিতেই।
একদিকে সবুজে সবুজ হয়ে থাকা পুরুলিয়ার ছবির মতো পথঘাট, অন্যদিকে জমিদারবাড়ির আলো-অন্ধকারে মোড়া অন্দর— সাত পর্বের সিরিজে সাসপেন্সের স্বাদ আরও একটু বাড়িয়ে দিয়েছে সিনেম্যাটোগ্রাফি। তাতেই গল্প এবং তা বলার মুন্সিয়ানায় জুড়ে গিয়েছে আরও খানিকটা গা ছমছমে ভাব। আর যেভাবে রহস্যভেদের সঙ্গে ঠিক ঠিক মশলায় মিশে গিয়েছে মনের চোরা অলিগলির গল্প, তাতেও সিরিজের স্বাদ বেড়েছে বেশ খানিকটা। বিশেষত, ছোট ছোট পর্বের এই কাহিনির প্রথম ভাগেই পাঁচ-পাঁচটা মৃত্যুর পরে ঢিমেতালে রহস্যের পরত খোলা, একটু একটু করে চরিত্রদের মনের গভীরে লুকোনো সত্যিগুলোকে চিনিয়ে দেওয়া স্লো বার্ন থ্রিলার হিসেবে উপভোগ্য করে তুলেছে ‘রঙ্কিনী ভবন’কে।
অভিনয়েও পুরো নম্বর দিতেই হয়। ওটিটি পর্দায় প্রথম পা রেখেই যূথিকা এবং আদিত্যনাথ হিসেবে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছেন শ্যামৌপ্তি এবং গৌরব। তাঁদের সম্পর্কের কেমিস্ট্রিও বেশ লাগে পর্দায়। পদ্মাবতী হিসেবে বরাবরের মতোই দুর্দান্ত বিদীপ্তা। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা চরিত্রে আলাদা করে ভাল লাগে অনিরুদ্ধকে। ছোট্ট ছোট্ট পরিসরে সুহোত্র, আভেরী, ঈশানী এবং তনিকাও চোখ টেনে ছাড়েন যথারীতি।
তবে রহস্যভেদের পথটা আরেকটু লম্বা, আরেকটু জটিল হলেও পারত। হতে পারত আরও একটু অচেনা ছকে হাঁটা। ইদানীং বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সৌজন্যে হরেক রকম থ্রিলার দেখতে অভ্যস্ত দর্শকের কাছে এ সিরিজের যাত্রাপথ এবং ক্লাইম্যাক্স খানিকটা সরল এবং চেনা ঠেকতেই পারে। তা ছাড়া, বনেদি বাড়ির গল্প-বলা সিরিজের সংখ্যা ইদানীং বাংলা ওটিটি দুনিয়ায় ক্রমশ বেড়েই চলেছে! এই ছোট্ট দুটো আফশোস রয়েই গেল অবশ্য!
