প্রথম সিজনের রহস্য গড়াল দ্বিতীয় সিজনে। সবুরে মেওয়া ফলাতে পারল কি ‘কালরাত্রি ২’?দেখলেন পরমা দাশগুপ্ত।
বনেদি বাড়ির অন্দর। তার আষ্টেপৃষ্টে যতটা জড়ানো আভিজাত্যের আলো, ঠিক ততটাই বোধহয় লুকোনো সত্যির অন্ধকার। এই থিমে ভর করেই একের পর এক সিরিজ নিয়ে আসছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই। সেই তালিকাতেই ২০২৪-এর ডিসেম্বরে নাম লিখিয়েছিল ‘কালরাত্রি’। সিরিজ জুড়ে বুনে দিয়েছিল অপরাধ-রহস্যের জাল। এক বছর পার করে এবার তারই দ্বিতীয় সিজন নিয়ে হাজির হলেন পরিচালক অয়ন চক্রবর্তী। অনসম্বল কাস্ট-এর হাত ধরে ফের পর্দায় জট পাকাল এই সিরিজ। যে জট কাটিয়ে রহস্যভেদও ঘটল শেষমেশ।
প্রথম সিজনে দেখা গিয়েছিল, নতুন বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই কালরাত্রিতে প্রাণ হারায় দেবীর (সৌমিতৃষা কুণ্ডু) স্বামী, রায়বর্মন পরিবারের বড় ছেলে রুদ্র (ইন্দ্রাশিস রায়)। অদ্ভুতভাবে এমনটাই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল দেবীর প্রাণের বন্ধু মায়া (কৌশানী মুখার্জি জাঞ্জিন)। ঘটনার তদন্তে আসেন ডিএসপি সাত্যকি (অনুজয় চট্টোপাধ্যায়) ও তার টিম। দর্শক একে একে জানতে পারেন, বাড়ির মেজো বউ রাইয়ের (স্বৈরীতি ব্যানার্জি) সঙ্গে তার শ্বশুর সমরেশ (দেবেশ চট্টোপাধ্যায়) এবং ভাসুর রুদ্রর পরকীয়ার কথা। রহস্যের জাল আরও ঘন করে বুনে দেয় দেবীর ছোট দেওর বরুণের (সৌনক রায়) মৃত্যু, সেই খুনের অভিযোগে মেজো দেওর অজিতেশের (রাজদীপ গুপ্ত) গ্রেফতারি এবং দেবীর আত্মহত্যার চেষ্টা।
ঠিক এখান থেকেই এবারের সিজন শুরু। গল্পে দেখা যায় রহস্যের জট খোলার আপ্রাণ চেষ্টায় সাত্যকি ও তার দলবল। যার সূত্রে বেরিয়ে আসছে একের পর এক অজানা তথ্য। এমনকী রায়বর্মণ বাড়ির এই রহস্যের সঙ্গে কোনও এক সুতোয় জড়িয়ে আছে সাত্যকির নিজের অতীতও। ইতিমধ্যে পরপর খুন হয়ে যায় দেবীর ননদ শিবানী এবং মেজো দেওর অজিতেশ। খুনের চেষ্টা হয় তার শাশুড়ির (রূপাঞ্জনা মিত্র) উপরেও। এমনকী গল্প এগোলে প্রাণ হারায় শ্বশুর সমরেশ নিজেও। কোন রহস্য লুকিয়ে রায়বর্মণদের বাড়ির অন্দরে? আততায়ী কি তবে পরিবারের কেউ? নাকি কোনও আক্রোশ বশে এমনটা ঘটিয়ে চলেছে বাইরের কোনও মানুষ? কেনই বা আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল দেবী? সিরিজ জুড়ে হন্যে হয়ে তারই উত্তর খুঁজেছেন সাত্যকি। অবশ্য পেয়েও গিয়েছেন শেষমেশ।
দেবীকে, তার বিপর্যস্ততা এবং মানসিক টানাপোড়েনকে জীবন্ত করে তুলেছেন সৌমিতৃষা। বিশেষত সিরিজের দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর অভিনয়ের বলিষ্ঠতা এক মুহূর্ত নজর ফেরাতে দেয়না। দেবীর শাশুড়ি বা সমরেশের স্ত্রী হিসেবে রূপাঞ্জনার গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব চোখ টানে বরাবরের মতোই। সাত্যকি হিসেবে অনুজয় যথারীতি দুরন্ত। লাস্যময়ী রাই হিসেবে নজর কাড়েন স্বৈরীতি। মায়াকে রীতিমতো বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন কৌশানীও। এবারের সিজনে বাকিদের অবশ্য তেমন কিছু করার ছিল না।
গল্পে রহস্যের জট আরও জটিল করে তুলতে একের পর এক সুতো ছড়িয়েছেন এবং জড়িয়েছেন পরিচালক-কাহিনিকার। যে রহস্যের জাল ভেদ করে সত্যির দিকে পৌঁছতে তাই হিমশিম খেতে হয় তদন্তকারীকে। ফলে থ্রিলারের স্বাদ জমাট বাঁধে আরও। দর্শক হিসেবে সেই টানটান উত্তেজনা উপভোগ করতে বেশ লাগে। তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। বনেদি বাড়ির অন্দর মানেই কি প্রত্যেকটা চরিত্রের একটা করে অন্ধকার দিক থাকা বাধ্যতামূলক? রহস্যগল্প বুনতে হলে একটা গোটা পরিবার বা তার আশপাশে সকলেরই লুকোনো কেচ্ছা থাকতে হবে কেন? সিরিজটা দেখতে দেখতে এ বিষয়টা নিশ্চিত ভাবেই ভাবিয়েছে। কারণ গল্পে প্রতিটা চরিত্রকে এই একই ধাঁচে বোনাটা একটু ক্লান্তিকর ঠেকে।
আর সত্যি বলতে কী, এই বনেদি বাড়ির কেচ্ছার গল্পও তো অনেক হল। এবার কি একটু অন্য ধারার থ্রিলারের প্লট ভাবা যায় না?
