জনপ্রিয় গল্প ফের হাজির পর্দায়। কেমন হল ‘রক্তফলক’? সিরিজ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।  


তন্ত্রের নেশায় মজে গেলেন নাকি পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়? 
‘নিকষছায়া’, ‘পর্ণশবরীর শাপ’, পেরিয়ে ফের তাঁর পরিচালনায় হইচইয়ের পর্দায় হাজির হল নতুন ওয়েব সিরিজ । ইতিহাস ও তন্ত্রের যুগলবন্দিতে মূল জনপ্রিয় গল্পটির লেখক অভীক সরকার। এর আগে ‘ভোগ’ সিরিজটিও হয়েছিল তাঁরই লেখা গল্প অবলম্বনে। 
সাহিত্য ও পর্দার এমন মিলমিশ যুগ যুগ ধরেই দেখতে অভ্যস্ত বাংলার দর্শক। ক্লাসিক সাহিত্য থেকে সমসাময়িক লেখকদের কাহিনি, সবই বিভিন্ন সময়ে জায়গা করে নিয়েছে ছবি, ধারাবাহিকে কিংবা হালফিলের ওয়েব সিরিজেও। কিছু ক্ষেত্রে মূল গল্প থেকে এক চুলও সরেননি পরিচালক-চিত্রনাট্যকার। কিছু ক্ষেত্রে আবার মূল গল্প অবলম্বনে তৈরি হলেও কিছুটা স্বাধীন পথে হেঁটেছে তার পর্দারূপের কাহিনি-চিত্রনাট্য বা পরিচালনা। দুই ক্ষেত্রেই দারুণ সব ছবি, ধারাবাহিক কিংবা ওয়েব সিরিজ নিজস্ব জায়গা তৈরি করে নিতে পেরেছে দর্শকমনে। 
‘রক্তফলক’ এই দ্বিতীয় গোত্রে পড়ে। পরিচালক পরমব্রত কিংবা চিত্রনাট্যকার শান্তনু মিত্র নিয়োগী বেশ খানিকটাই সরে এসেছেন মূল গল্প থেকে। অভীক সরকারের এই গল্পটি কিংবা তার অডিও স্টোরি পাঠক কিংবা শ্রোতামহলে ভীষণ জনপ্রিয়। ফলে সিরিজের ঘোষণা হতেই প্রত্যাশার পারদ চড়েছিল অনেকখানি। বিশেষত, গল্পের মূল চরিত্র, তন্ত্রসাধক আগমবাগীশের ভূমিকায় শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়কে দেখতে মুখিয়ে ছিলেন দর্শকেরা। কিন্তু সিরিজ মুক্তি পাওয়ার পরে আগ্রহ পাল্টে গেল হতাশায়। অনেকেই মূল গল্প থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব পথে গল্পের এগিয়ে চলা মেনে নিতে পারেননি। আবার অনেকের বক্তব্য, গল্প নিজের মতো করলেও তার বুনোট কিংবা প্লট কোনওটাই পছন্দসই হয়ে উঠতে পারেননি। 


কিছুটা মূল গল্পের পথ ধরে চলা, বাকিটা নিজের মতো এগোনো এই সিরিজের শুরুতেই দেখা যায়, বালুরঘাটের দত্তগুপ্ত পরিবারের এক সদস্য (সঞ্জীব সরকার) মালদহের এক জঙ্গলে ঘেরা জায়গায় জমি দেখতে গিয়ে এক ভুতুড়ে ঘটনার শিকার হন। আচমকা এসে তাকে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন তন্ত্রসাধক আগমবাগীশ (শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়)। ইতিমধ্যে দত্তগুপ্ত পরিবারেও বিপদ ঘনিয়ে এসেছিল। পরিচারিকার ভুলে বৌদ্ধতন্ত্রের এক অদ্ভুতদর্শন দেবীমূর্তির ফলক ঠাঁই পায় বাড়ির ঠাকুরঘরে। তারপর থেকেই বাড়ির সদস্যদের দেখা দিতে থাকে রক্তমাখা প্রেতিনীমূর্তিরা। এবারেও আচমকা বাড়িতে এসে হাজির আগমবাগীশ। ভীতসন্ত্রস্ত পরিবার পরিত্রাণের আশায় তাঁর সাহায্য চায়। এসবের মাঝখানেই ফেসবুকে আলাপ হওয়া বন্ধু, আইটি সেক্টরের কর্মী স্যমন্তক হালদারের (অর্জুন চক্রবর্তী) প্রেমের জালে পা দিয়ে বাড়ি থেকে পালায় দত্তগুপ্তদের যৌথ পরিবারের কিশোরী কন্যা তিতলি (মোহনা মাইতি)। দিদির সঙ্গী হয় তার দুই তুতো বোনও।

এদিকে সমান্তরালে আরও দুইটি টাইমলাইন দেখতে থাকেন দর্শক। একটিতে হাজার বছর আগে সোমপুর মহাবিহারে সিদ্ধিলাভের আশায় তিন কিশোরী কন্যাকে বলি দেয় বজ্রকেতু (অর্জুন)। বৌদ্ধবিহারে এমন ভয়াবহ অপরাধের শাস্তিবিধানে তাকে অভিশাপ দেন মহাস্থবির রত্নাকর শান্তি (রজত গাঙ্গুলি)। অন্য টাইমলাইনটিতে দর্শকের সঙ্গে পরিচয় হয় মানসিক বিকারগ্রস্ত এক সদ্য তরুণ টেনিয়া ও তার মায়ের (কণীনিকা ব্যানার্জি)। নিত্য অপরাধে জড়িয়ে পড়া টেনিয়া বাড়িছাড়া হয়। আত্মঘাতী হয় তার মা।

তিনটি টাইমলাইনের তিন ঘটনাস্রোত বা চরিত্ররা কীভাবে জড়িয়ে আছে একে অপরের সঙ্গে? আগমবাগীশ কি পারবেন দত্তগুপ্ত পরিবারের বিপদ কাটিয়ে দিতে? কী অপেক্ষা করছে তিতলি ও তার বোনেদের জন্য? আগমবাগীশ কি তাদের সুস্থশরীরে ঘরে ফেরাতে পারবেন? এ সব নিয়েই এগিয়েছে সিরিজের গল্প। 
অভিনয় এ সিরিজের সম্পদ। আগমবাগীশ হিসেবে শাশ্বত যথারীতি দুরন্ত। স্যমন্তক ও বজ্রকেতুর চরিত্রকে কখনও ঝকঝকে স্মার্টনেস, কখনও জেদী প্রেমিক, কখনও বা নিষ্ঠুর হিংস্রতার নানা রকম অনুভূতিতে জীবন্ত করে তুলেছেন অর্জুন। সদ্য প্রেমে উথালপাথাল, কাউকে পরোয়া করতে না চাওয়া তিতলিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন মোহনাও। কিন্তু কণীনিকা বা রজতের মতো এমন বলিষ্ঠ দুই অভিনেতাকে স্রেফ দু-তিনটে দৃশ্যের জন্য ভাবা হল কেন কে জানে! এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে চোখ টানাটুকু ছাড়া আর কিছু করার ছিলনা দু’জনেরই।

চিত্রনাট্যকার কিংবা পরিচালক চেয়েছিলেন ইতিহাস আর বর্তমানকে এক সুতোয় গাঁথতে। তাই তন্ত্রের সঙ্গেই এই গল্পে জায়গা করে নিয়েছে বাস্তব জগতের দিনযাপন কিংবা নারীপাচারের মতো অপরাধও। তার নেপথ্যে অবশ্যই পরমব্রত ও শান্তনুর মুন্সীয়ানা। সব কিছুর মিলমিশে গল্পের স্বাদ বাড়তেই পারত অনেকখানি। প্রথম দিকে কিছুটা ঢিমেতালে হলেও আকর্ষণ তৈরি করছিল শুরুর দিকের পর্বগুলো। 
কিন্তু সিরিজ যত এগোল, সবটা যেন কেমন জগাখিচুড়ি হয়ে গেল। তিনটে টাইমলাইন জুড়ে গল্প বুনতে গিয়ে কোথাও কোথাও যেন একটু দিশাহারা ঠেকল। যেমন সিরিজের মাঝামাঝি থেকে গল্পের গতি বাড়ল ঠিকই, কিন্তু বিশেষত অর্জুনের চরিত্রগুলোর নেপথ্যকাহিনির নিরিখে তার জার্নিটা বড্ড খাপছাড়া হয়ে থাকল। আগমবাগীশও যখনতখন মুঠো মুঠো সর্ষে ছড়িয়ে, ইতিহাসের গল্প বলে হুড়মুড় করে ক্লাইম্যাক্সের দিকে এগিয়ে গেলেন। আর তিতলির মতো স্মার্ট জেন জি কন্যে স্রেফ ফেসবুকের আলাপ আর ফোনে কথাবার্তার ভরসায় বিয়ে করবে বলে বালুরঘাট থেকে কলকাতা রওনা দিল কিংবা দুই বোনকেও সঙ্গে নিল কেন, সেই অঙ্কও মেলানো কঠিন।

এছাড়া, নয়ের দশকের হিন্দি ছবির ধাঁচে তিন রক্তমাখা পেত্নীও স্রেফ তিনটি দৃশ্যে ছাড়া গল্পে নেই কেন, বৌদ্ধদেবী হেরুককে এভাবে জাগিয়ে তোলা ছাড়া উপায় ছিল কিনা, শেষবেলার নৃশংস অপরাধে কারও কোনও সাজা হল না কেন— সে  প্রশ্নগুলো বরং থাক।  

তবে হ্যাঁ, বলিষ্ঠ অভিনয়ের হাত ধরে কিছুটা হলেও উতরে যায় সিরিজ। মূল গল্প যদি আপনার পড়া না থাকে কিংবা তার থেকে সরে এসে নতুন পথে গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় আপত্তি না থাকে, তবে যুক্তি-তর্ক দূরে সরিয়ে রেখে ‘রক্তফলক’ দেখতেই পারেন। ভাল লাগতেই পারে।