একেনবাবু হাজির পুরুলিয়ায়। ছুটিতে গিয়ে এবার কীসের পর্দাফাঁস? সিরিজ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
ছুটি কাটাতে গিয়ে ফের নতুন কেসে জড়িয়ে পড়া।
আবারও সেই অনন্ত খাইখাই এবং অনবরত ভুল প্রবাদের ফুলঝুরি।
এবার তার সঙ্গে জুটে গেল নিরামিষ খেতে বাধ্য হওয়ার দেদার দুঃখ এবং মানভূমের ভাষা শেখার প্রবল প্রয়াস। কিন্তু সব মিলিয়ে যেটা দাঁড়াল—একেনবাবুর নতুন কীর্তিকলাপ, মানে নববর্ষে হইচইয়ের নতুন সিরিজ ‘একেনবাবু: পুরুলিয়ায় পাকড়াও’ কিন্তু একেবারে পয়লা বৈশাখী মাংসভাতের মতোই উপভোগ্য!
এবারের গল্পে লালবাজারের দুঁদে গোয়েন্দা একেন্দ্র সেন অর্থাৎ একেনবাবুর (অনির্বাণ চক্রবর্তী) ছুটির ঠিকানা পুরুলিয়া। সঙ্গে যথারীতি তাঁর দলবল, বাপি (সুহোত্র মুখোপাধ্যায়) এবং প্রমথ (সোমক ঘোষ)। অযোধ্যা পাহাড়ের দেশে পৌঁছতে না পৌঁছতেই নতুন কেস হাজির। সেখানকার উপাসনা আশ্রমের মহারাজ অমিয়নাথ সেনের (সুমন্ত মুখোপাধ্যায়) লকার থেকে খোয়া গিয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বহুমূল্য পান্নার হার। ফলে রীতিমাফিক পৌষ পরব কিংবা ছৌ নাচের উৎসব যায় থমকে। কারণ, আশ্রম প্রতিষ্ঠাতা কালীপ্রসন্ন সেনের মূর্তিতে ওই হার পরিয়েই পরবের বোধন হয় প্রতি বছর। অগত্যা পরব দেখতে আসা একেনবাবুর উপরেই সেই হার খোঁজার ভার দেন অমিয়নাথ। সঙ্গে থাকেন পুলিশ অফিসার নিখিল (অনিমেষ রানা ভাদুড়ী)। বিষয়টা জানতেন অমিয়নাথের বন্ধু তথা আশ্রমের শিক্ষক সুবিমল (সন্দীপ ভট্টাচার্য), অমিয়নাথের চিকিৎসক শুভঙ্কর কুণ্ডু (শঙ্কর চক্রবর্তী), আশ্রমিক অনুকূল (অভিষেক বসু) এবং লাইব্রেরিয়ান মনিকা (শাঁওলি চট্টোপাধ্যায়)।
সন্দেহের তালিকায় নাম উঠে যায় তাদের সকলেরই। সেই সঙ্গে তাঁকে ধন্দে ফেলতে থাকে আশ্রমেরই এক বিচ্ছু খুদে সম্বুদ্ধের (সার্থক মল্লিক) বলা একের পর এক ধাঁধা। ইতিমধ্যে দর্শকও টের পেতে থাকেন কারা কারা জড়িয়ে থাকতে পারে এই হার চুরিতে। কিন্তু সেই মানুষগুলোই কি এই কাণ্ড ঘটিয়েছে? একেনবাবু কি তাদের নাগাল পাবেন? নাকি তদন্তে বেরিয়ে আসবে অন্য কারও নাম, অন্য কোনও সত্যি? সব উত্তর পাবেন সাত পর্বের জমাটি সিরিজে।
প্রয়াত সুজন দাশগুপ্তের গোয়েন্দা কাহিনি অবলম্বনে পদ্মনাভ দাশগুপ্তের চিত্রনাট্য ও জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় একেনবাবুর কাণ্ডকারখানার এই সিরিজের প্রতিটা সিজনই বরাবর মন কেড়ে এসেছে। একেনবাবুর ছবির চেয়ে সিরিজ যে বেশি উপভোগ্য, সেটাও বলেন অনেকেই। নতুন সিজনও মোটেই তার ব্যতিক্রম নয়। একেন-বাপি-প্রমথ ত্রয়ীর দুরন্ত রসায়ন আর কমেডি টাইমিংয়ে এবারেও যথারীতি নিরাশ করেননি অনির্বাণ, সুহোত্র বা সোমক কেউই। সঙ্গে শুরু থেকেই আমেজ বেশ খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে পুরুলিয়ার পাহাড়, জঙ্গল আর লালমাটির পথ বেয়ে গাড়ি ছোটানোর দৃশ্যগুলো। একের পর এক ট্যুইস্টে গল্পের গতিও ঢিমে হয়নি কোথাওই। অভিনয়ে গল্পের বিভিন্ন চরিত্রে যাঁর যাঁর পরিসরে নজর কেড়েছেন সুমন্ত, শাঁওলি, রানা কিংবা সন্দীপ। তবে গোটা সিরিজে যার অভিনয় চমকে দেয়, সে সার্থক। অনির্বাণ, সুহোত্র, সোমকদের সঙ্গে সমানতালে টক্কর দিয়ে চোখ টেনে গিয়েছে এই খুদে অভিনেতা।
যদিও দর্শক হিসেবে গোটা তিনেক অভিযোগ থেকেই যায়। প্রথমত, সিরিজের আটটা সিজন এবং গোটা তিনেক সিনেমা পেরিয়ে এবারের গল্প ন’নম্বর সিজন। এতদিনে দর্শকের মুখস্থ হয়ে গিয়েছে একেনবাবুর খাইখাই বাতিক, ভুলে ভরা প্রবাদ বলে যাওয়ার অভ্যাস এবং সে সব নিয়ে বাপি-প্রমথর খুনসুটি। নতুন সিজনের প্রতিটা পর্বে যত্রতত্র সেই একই বিষয়ের দৃশ্য ঠেসে দেওয়াটা তাই কোথাও কোথাও একটু ক্লান্তিকর ঠেকে। দ্বিতীয়ত, সার্থকের অভিনয় দুরন্ত হলেও মানভূমের আদিবাসীদের ধাঁচে সংলাপের নিরিখে তার চেহারা-চালচলন বেশ খানিকটা শহুরে মনে হয়। বিশেষত শহুরে চেহারার বাকি অভিনেতারা যেখানে শহুরে ভাষাতেই সংলাপ বলেন। এবং তৃতীয় ও সবচেয়ে মারাত্মক নালিশ হল, একেনবাবুর মতো সুস্বাদু সিরিজের ট্যুইস্টের ধরন বাঙালির হাড়েমজ্জায় ঢুকে থাকা কালজয়ী ছবি থেকে ধার করা কি খুব জরুরি ছিল? নতুন কিছু ভাবলে হত না?
তবে ট্যুইস্ট চেনা হোক বা অচেনা, গল্প কিন্তু জমেছে জব্বর। সেকথা একশোভাগ সত্যি!
















