ওড়িয়া সঙ্গীতজগতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক ও গীতিকার অভিজিৎ মজুমদার রবিবার ভুবনেশ্বরের এইমসে প্রয়াত হলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। রবিবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শিল্পী।চিকিৎসক সূত্রে জানা গিয়েছে, উচ্চ রক্তচাপ ও লিভার সংক্রান্ত জটিলতা-সহ একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন অভিজিৎ। শনিবার রাতে হঠাৎ করেই তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। এরপর তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হলেও শেষরক্ষা হয়নি।

ওড়িয়া ও সাম্বলপুরি চলচ্চিত্র ও অ্যালবামের জন্য ৭০০-রও বেশি গান রচনা করা অভিজিৎ মজুমদার ছিলেন রাজ্যের সঙ্গীতজগতের অন্যতম পরিচিত নাম। তাঁর সুরে ভর করেই একাধিক ছবি ও অ্যালবাম পেয়েছে জনপ্রিয়তা।

অভিজিৎ মজুমদারের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন ওডিশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক। এক্স -এ তিনি লেখেন,“বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক ও গীতিকার অভিজিৎ মজুমদারের প্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত। ওড়িয়া সঙ্গীতজগতে তাঁর অবদান চিরকাল স্মরণীয় থাকবে। এই কঠিন সময়ে তাঁর পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা রইল। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।”


গত বছরের আগস্ট মাস থেকেই অসুস্থতা বাড়তে থাকে অভিজিতের। ২৭ আগস্ট হঠাৎ তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়। প্রথমে তাঁকে কটকের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, তাঁর শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়েছে। পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় ৩১ আগস্ট তাঁকে আইসিইউ-তে স্থানান্তর করা হয়।এরপর অবস্থার আরও অবনতি হলে গত ৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে ভুবনেশ্বর এইমসের জরুরি বিভাগে আনা হয়। তখন তিনি প্রায় কোমা-সদৃশ্য অবস্থায় চলে গিয়েছিলেন। তাঁকে আইসিইউ-তে স্থানান্তর করে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়। এইমস সূত্রে জানানো হয়েছিল, একাধিক বিভাগের চিকিৎসক দল তাঁর চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন।
এরপর ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে ভেন্টিলেটর থেকে সরানো হলেও তাঁর কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের অবস্থা তখনও  সঙ্কটজনক ছিল। ফলে আইসিইউ-তেই চিকিৎসা চলতে থাকে। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তাঁকে আইসিইউ থেকে বাইরে আনা হয়, তবে চিকিৎসা বন্ধ হয়নি।

অক্টোবরে ফের তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তাঁকে আবার আইসিইউ-তে ভর্তি করতে হয়। একাধিকবার ভেন্টিলেটর সাপোর্ট নিয়ে চিকিৎসা চললেও তিনি কোমাতেই ছিলেন। তবে নভেম্বরে তাঁর স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতির খবর মিলেছিল, যা অনুরাগীদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছিল।

 

৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ জানানো হয়, দীর্ঘ চিকিৎসার পর অভিজিতের অবস্থা অনেকটাই স্থিতিশীল এবং শিগগিরই তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হতে পারে। নতুন বছরে তাঁকে আবার আগের মতো সক্রিয় দেখতে পাওয়ার আশায় বুক বাঁধছিলেন অনেকে। কিন্তু সেই আশাই শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেল এদিন।অভিজিৎ মজুমদারের পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে শিল্পীর দেহ নিয়ে যাওয়া হবে কটকে ।সেখানেই পালন হবে তাঁর শেষকৃত্য। 

১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এ জন্ম অভিজিৎ মজুমদারের। ২০০০ সালের শুরুর দিকে সঙ্গীতজগতে পা রাখেন তিনি। প্রায় তিন দশকের কেরিয়ারে ওড়িয়া চলচ্চিত্র ও অ্যালবামের জন্য একের পর এক জনপ্রিয় সুর উপহার দিয়েছেন তিনি। ‘লভ স্টোরি’, ‘সিস্টার শ্রীদেবী’, ‘গোলমাল লভ’, ‘সুন্দরগড় রা সলমন খান’, ‘শ্রীমান সুরদাস’-এর মতো ছবিতে তাঁর সুর আজও শ্রোতাদের মনে গেঁথে রয়েছে। 

একজন সুরকারের মৃত্যু মানেই শুধু একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়। একটা সময়, একটা আবহ, একটা সুরেলা অধ্যায়ের অবসান। অনুরাগীদের আশা, অভিজিৎ মজুমদার রয়ে যাবেন তাঁর সৃষ্টি করা সুরেই।