প্রেক্ষাগৃহে দর্শক আসছে না। অভিযোগ,সব বাংলা ছবি সেভাবে দর্শক টানতে পারছে না। এদিকে প্রাইম টাইমে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রাখতেই হবে বাংলা ছবি। আবার এও শোনা যাচ্ছে পর্যাপ্ত বাংলা ছবি না থাকায় প্রাইম শোয়ে হল খালি যাচ্ছে। তাই চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই বন্ধ প্রিয়া, নবীনা, বিনোদিনী-র মতো কলকাতার প্রথম সারির সব প্রেক্ষাগৃহ! না কি বলা ভাল বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন এই হল মালিকরা? এহেন আবহেই ‘ধূমকেতু’ ছবির প্রযোজক রাণা সরকার একটি পোস্ট করেছেন সমাজমাধ্যমে। ঝড়ের গতিতে সেটিও ভাইরাল হচ্ছে সমাজমাধ্যমে। তাঁর সেই পোস্টে হলমালিকদের কটাক্ষ করার পাশাপাশি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন ভাসিয়ে দিয়েছেন রাণা! এবার সত্যিটা খোঁজ নিল আজকাল ডট ইন।
সোমবার থেকেই বন্ধ রয়েছে প্রিয়া। কারণ জিজ্ঞেস করতেই ‘প্রিয়া’র কর্ণধার অরিজিৎ দত্ত বলে উঠলেন, “আপনাকে ছোট্ট একটা হিসেবে দিই। আমার হলের ইলেকট্রিক বিল আসে মাসে ৬ লক্ষ টাকা। হলের সব কর্মচারীদের মাসমাইনে মিলিয়ে ধরুন লাখ দুয়েক। প্রতিদিন আমার হলের একটা মেইনটেনেন্স খরচ আছে। সেটা মাস শেষে পৌঁছয় ১ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। এর পরে আরও রয়েছে। তিন মাস অন্তর প্রিয়া-কে ৮ লক্ষ টাকা কর দিতে হয়। সব হিসেবে করে দেখুন গড়ে প্রতিদিন আমার ১ লক্ষ টাকা খরচ! ভাবতে পারেন। সেখানে গত কয়েকদিন প্রিয়ার টিকিট বিক্রি হয়েছে অন্যদিন ৫ হাজার টাকার, কোনওদিন ৬ হাজার টাকা। এভাবে চলা যায়? আরে, বাংলা ছবি প্রাইম টাইমে চালাতে আমার আপত্তি থাকবে কেন? কিন্তু কন্টেন্টও তো সেভাবে তৈরি করতে হবে ছবি নির্মাতাদের। দর্শক তো আসছেই না তেমন করে শেষ যে ক'টি বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছে। সেটাও তো কেউ বলুক। একা তো শুধু আমাদের হল মালিকদের দায় নয়! ভাল কথা, সম্প্রতি যে হিন্দি ছবিগুলো মুক্তি পেয়েছে, সেগুলোও চালিয়েছি আমার হলে। সেখানেও হতাশ হয়েছি। ভাল চলেনি।
এখানে আর একটা জরুরি কথা বলা দরকার। রাণা সরকার যে পোস্টটি করেছেন, তার প্রেক্ষিতে। প্রথমত, রাণা তো সবকিছুতেই ষড়যন্ত্র দেখেন। ওঁর পোস্টগুলো একটু মন দিয়ে দেখলেই লক্ষ্য করবেন, সব ব্যাপারেই ও জোরজন্ত্রের গন্ধ পায়। যাক সে কথা, আমি আপনাদের মাধ্যমে ওঁকে বলছি, উনি প্রিয়ার প্রতিদিনের খরচ দিক ১ লক্ষ টাকা, আমি এক্ষুনি প্রিয়ার প্রতিদিনের প্রতিটি শো-এ বাংলা ছবি চালাব! সোজা কথা!”
কথাশেষে তাঁর সংযোজন, “শুক্রবার থেকে প্রিয়া খুলছে। ‘দ্য কেরালা স্টোরি ২’ চালাব। দু-তিন দিন দেখব। যদি ক্ষতির পরিমাণ এভাবেই চলে সোমবার থেকে আবার বন্ধ ওরে দেব প্রিয়া! এরপর ধুরন্ধর ২ আসছে। ওটাই চালাব সারাদিন! কিচ্ছু করার নেই আমার। খরচটা তো তুলতে হবে নইলে হল তো লাটে উঠবে।”
দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় প্রেক্ষাগৃহ ‘নবীনা’। ৫০ বছর পেরিয়েও মাল্টিপ্লেক্সের জমানায় আজও টানটান এই সিঙ্গল স্ক্রিনের চাহিদা। বলিউডের ছবির পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাংলা ছবিও দেদার ‘চলে’। চলতি সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকে দর্শকের জন্য বন্ধ হয়েছে এই প্রেক্ষাগৃহের দরজা। ‘নবীনা’র কর্ণধার নবীন চৌখানি এই প্রসঙ্গে খোলাখুলি বললেন, “ দেখুন, আমি মোটেও লোকসান হচ্ছে বাংলা ছবি চালিয়ে - এই মর্মে নবীনা বন্ধ রাখিনি। যারা এসব রটাচ্ছে, বাজে কথা বলছে! নবীনার অন্দরে কাজ চলছে মেরামতির। অনেকদিন ধরেই বাকি পড়ে ছিল। বেশ কিছুদিন লাগবে সব মিলিয়ে। আগামী ১৭ মার্চ নবীনা আবার খুলে যাবে! আর একটা কথা। আর যে যে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়েছে বলে সবাই বলাবলি করছে, তাদের টিকিট বুকিং তো দেখাচ্ছে এই সপ্তাহান্তের শো-এর। সুতরাং বন্ধ হল কোথায়? যাই হোক, এটাও বলব ওদিকে যাঁরা কান্নাকাটি উড়ছে যে আমার লোকসান হয়ে যাচ্ছে...তাঁদের এই কথাটাও মাথায় রাখা উচিত যে এটা ব্যবসা। এরকম মন্দ সব ব্যবসাতেই কখনও না কখনও আসে। তুমি শুধু লাভ দেখে যাবে আর লোকসানের মুখ দেখবে না -এটা কী করে হয়? তাই কান্নাকাটি বন্ধ হোক নইলে ব্যবসা বন্ধ করে দিক!"
অন্যদিকে, গত মঙ্গলবার থেকে শো বন্ধ বিনোদিনী থিয়েটারেও(স্টার)। আজকাল ডট ইন-কে বিনোদিনী থিয়েটারের কর্ণধার জয়দীপ মুখোপাধ্যায় বললেন, "বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনও শো চলবে না, এটা ঠিক। কিন্তু আগামী শুক্রবার থেকেই ফের খুলে যাবে বিনোদিনীর দরজা। ‘প্রজাপতি ২’, ‘প্রোমোটার বৌদি’ চলবে। থাকবে আরও একটি বাংলা ছবি। আর দেখুন, রাজ্য সরকার কিন্তু দারুণ সাহায্য করে প্রেক্ষাগৃহ চালানোর ব্যাপারে। আমাদের সুবিধে-অসুবিধের দিকে খেয়াল রাখে। এটা অস্বীকারের কোনও জায়গা নেই। তবে পাশাপাশি এটাও বলব, বাংলা ছবিও তো তেমন করে প্রযোজক, পরিচালকদের তৈরি করতে হবে যাতে সেরকম ছবি আমরা প্রাইম টাইমে হলে চালিয়ে টাকাটাও তুলতে হবে। চলতি মাসেই ঢাক ঢোল পিটিয়ে যে বাংলা ছবিটি মুক্তি পেল দর্শক তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। নূন্যতম সংখ্যার সেই দর্শক আছেন না যে ছবিটি আমরা চালাতে পারব। ভাবুন একবার! আর যে বড় প্রযোজক ফেসবুকে বিপ্লব করছেন, তিনি বা তাঁর মতো ক'জন বছরে ক'তা বাংলা ছবি বানান? ক’টা তারকা তৈরি করেন যাদের দেখার জন্য দর্শক আসবে? সেই তো আমাদের ভরসা করতে হয় দেব, জিৎ, প্রসেনজিৎ অভিনীত ছবিগুলোর উপর। আসলে, ফেসবুকে ষড়যন্ত্রের কথা লেখা সহজ, লিখতেও মজা লাগে। তাই না?
আমরা তো তাও কলকাতার প্রেক্ষাগৃহ, একটা সময়ের পর সামলে নেব লোকসান। কিন্তু যেসব প্রেক্ষাগৃহ গ্রামে-গঞ্জে রয়েছে সেগুলোর অবস্থা কি ওই প্রযোজক জানেন? ফেসবুক বিপ্লবীরা জানেন? আমরা প্রেক্ষাগৃহ চালাই শুধু লাভের কড়ি কামাব বলে নয়। প্যাশন থেকে, ভালবাসা থেকে এই কাজ করি। নইলে গ্রামে গঞ্জে রীতিমতো সংগ্রাম করে যারা প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতি চালাচ্ছেন তারা যদি গোডাউন হিসেবে ভাড়া দেন, কয়েক গুণ বেশি আয় করতে পারবেন। তাঁরা কিন্তু করেন না। আমরা কিন্তু করি না। এটাও যেন সবাই মনে রাখে। এটুকুই আমার অনুরোধ।”
&t=313s
