বাংলা থেকে এ বছর মোট ১১ জনকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হচ্ছে। সেই তালিকায় বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব হরিমাধব মুখোপাধ্যায়। বালুরঘাটের এই বিশিষ্ট থিয়েটারকর্মীকে মরণোত্তর পদ্মশ্রী সম্মান দেওয়া হচ্ছে, যা বাংলার নাট্যমঞ্চের দীর্ঘ দিনের লড়াই ও অবদানের এক জাতীয় স্বীকৃতি বলেই মনে করছে শিল্পীমহল।‘ত্রিতীর্থ’ নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা হরিমাধব মুখোপাধ্যায় তাঁর লেখা ও নির্দেশনায় বাংলা থিয়েটারকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। ছোট নাটক, একাঙ্ক, পূর্ণাঙ্গ নাটক মিলিয়ে প্রায় ৬০টি নাটকের স্রষ্টা তিনি। শুধু বাংলা নয়, রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও তাঁর নাটক প্রশংসিত হয়েছে। নাট্যচর্চায় নিরলস অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন সঙ্গীত নাট্য একাডেমির জাতীয় পুরস্কার। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ দীনবন্ধু পুরস্কার, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে বঙ্গভূষণ সম্মান, কাঞ্চনজঙ্ঘা পুরস্কার, রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিলিট সম্মান-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতিও এসেছে তাঁর ঝুলিতে।‘জল’, ‘দেবাংশী’, ‘অসমাপিকা’, ‘কনন’, ‘বিছন’, ‘গ্যালিলিও’ -এই নাটকগুলি আজও বাংলা থিয়েটারের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ‘দেবাংশী’ এক সময় গোটা বাংলার নাট্যচর্চায় আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল।
এবার সেই নাট্যব্যক্তিত্বের জীবন ও ভাবনার ছায়া অবলম্বনে বড়পর্দায় আসছে একটি চরিত্র। জনপ্রিয় অভিনেতা লোকনাথ দে অভিনয় করছেন সেই ভূমিকায়। সায়ন্তন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি ‘ফুটানিগঞ্জের মহেশ’-এ মুখ্যচরিত্র চন্দ্রমাধব শীল হিসেবে বড়পর্দায় দেখা যাবে লোকনাথকে। তাঁর সঙ্গে দেখা যাবে অমিত সাহা, খরাজ মুখোপাধ্যায়, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় অর্ণ মুখোপাধ্যায়-এর মতো দাপুটে অভিনেতাদেরও।
আজকাল ডট ইন-কে লোকনাথ দে বলেন,“একজন থিয়েটারকর্মী হিসেবে গর্ব তো হচ্ছেই। হরিমাধববাবু মরণোত্তর এই সম্মান পেলেন, তবুও আমাদের মতো থিয়েটারের মানুষদের কাছে এটা ভীষণ গর্বের বিষয়। তাঁর কাজই তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছে, এটাই স্বাভাবিক। আবার এটাও ঠিক, স্বীকৃতি পাওয়া বা না পাওয়ায় কারও কাজের গুরুত্ব কমে না। কিন্তু পদ্মশ্রী তো দেশের প্রথম সারির সম্মানগুলোর মধ্যে পড়ে, তাই আনন্দটা আলাদা।”
হরিমাধব মুখোপাধ্যায়-এর নাটকের মধ্যে তাঁর প্রিয় নাটকের কথাও স্মরণ করেন তিনি।“হরিমাধববাবুর ‘দেবাংশী’ আমার ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দের। ওই নাটকটা একটা সময় গোটা বাংলা কাঁপিয়ে দিয়েছিল,” বলেন লোকনাথ।

সেই প্রসঙ্গ ধরেই অভিনেতা জানান, সম্প্রতি যে ছবিটিতে তিনি কাজ করেছেন, সেটি আসলে হরিমাধব মুখোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানানো। “আমার অভিনীত চরিত্রটা ওঁরই ছায়া থেকে তৈরি। আমরা তো ওঁর নাটক দেখে বড় হয়েছি। দূর থেকে দেখে, একলব্যের মতো শিখেছি। তাই এই ছবিতে কাজ করার সুযোগ পাওয়া আমার কাছে গর্বের,” বলেন তিনি।
লোকনাথ আরও জানান, ছবিতে শুধু শিল্পীর সাফল্য নয়, তাঁর সংগ্রামের দিকটাও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। “মফঃস্বলে থেকেও কীভাবে কলকাতার থিয়েটারকে চ্যালেঞ্জ করে দুর্দান্ত প্রোডাকশন তৈরি করেছিলেন সেই সময়ের প্রায় সেরা মানের কাজ...সবটাই ছবিতে আছে।”
কথাশেষে অভিনেতার সংযোজন, সময়ের রাজনৈতিক টানাপোড়েনে হরিমাধব মুখোপাধ্যায়ের থিয়েটারও যে বাধার মুখে পড়েছিল, সেই অধ্যায়ও ছবিতে এসেছে তবে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে।“আমার চরিত্রটি থিয়েটারের কাজে পদে পদে বাধা পাচ্ছে, আর যে বাধা দিচ্ছে, সে এক সময় ওঁরই ছাত্র—এখন আবার এক রাজনৈতিক দলের মুখ। শেষমেশ থিয়েটারের বদলে বড়পর্দাকেই বেছে নিতে হয় তাকে। সেখানেও সে সাফল্য পায়। এই শিল্পীর লড়াই আর উত্তরণই আসলে ‘ফুটানিগঞ্জের মহেশ’।”
পদ্মশ্রী ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাই শুধু একজন শিল্পীর নাম নয়, বাংলা থিয়েটারের দীর্ঘ সাধনা, সংগ্রাম আর উত্তরাধিকারের কথাও নতুন করে উঠে এল আলোয়।
