তিনি যখনই পর্দায় আসেন, প্রেক্ষাগৃহে হাততালি পড়ে। কিন্তু এবার তিনি যা করলেন, তাতে স্রেফ টলিউড নয়, কেঁপে গেল বাংলার রাজ্য রাজনীতি। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে, গত এপ্রিল মাসে সবাইকে চমকে দিয়ে তৃণমূলের টিকিটে রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন কোয়েল মল্লিক। রাজনীতির অলিন্দে পা রেখেই বলেছিলেন, “দেশের সেবা, মানুষের সেবা করার চেয়ে মহৎ কাজ আর হয় না।” কিন্তু সেই ‘মহৎ দায়িত্ব’ কাঁধে নেওয়ার মাত্র দু-মাসের মাথায় ফের এক মহাবিস্ফোরণ! জানা যাচ্ছে, আচমকাই ইমেল মারফত ইস্তফাপত্র পাঠিয়েছেন রঞ্জিত-কন্যা।
একদিকে যখন টলিউড থেকে নবান্ন— সর্বত্র এই ‘পদত্যাগ’ নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই রাজনীতির চড়া রোদ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, সাতসমুদ্র পাড়ে সম্পূর্ণ অন্য মেজাজে ধরা দিলেন অভিনেত্রী। দেশ জুড়ে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন তুমুল চর্চা, কোয়েল তখন সপরিবারে মার্কিন মুলুকে ব্যস্ত জীবনের সেরা কিছু পারিবারিক মুহূর্ত উদযাপনে। শহর ছাড়ার সময় বিমান থেকেই একটি রহস্যময় অথচ মিষ্টি স্টোরি পোস্ট করেছিলেন কোয়েল। নেটিজেনরা ভেবেছিলেন, বোধহয় রাজনীতির ঝোড়ো হাওয়া থেকে বাঁচতে বস্টন বা নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে ছুটি কাটাচ্ছেন অভিনেত্রী। সঙ্গে ছিলেন বাবা রঞ্জিত মল্লিক ও মা দীপা মল্লিক। কিন্তু কোয়েল নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় খোলসা করলেন আসল সত্যিটা। এই সফর স্রেফ ‘ভ্যাকেশন’ ছিল না, এর পেছনে ছিল মল্লিক পরিবারের এক ভীষণ আবেগের অনুষ্ঠান।
আমেরিকা সফরের আসল উদ্দেশ্য ছিল কোয়েলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ‘দাদা’ তথা খ্যাতিসম্পন্ন প্রখ্যাত সেতারবাদক ইন্দ্র রায়চৌধুরী এবং কুহুকী কুমারী দাসের শুভ বিবাহ।সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগঘন কোয়েল লিখেছেন- "আমাদের আমেরিকা সফরের একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল দাদা ইন্দ্র রায়চৌধুরী ও কুহুকী কুমারী দাসের বিয়েতে যোগ দেওয়া। কী যে দারুণ সময় কাটালাম! নবদম্পতিকে জানাই আজীবন সুখী দাম্পত্য জীবনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।"
কোয়েলের শেয়ার করা একগুচ্ছ ছবিতে কোনও সেলিব্রিটি সুলভ দেখনদারি ছিল না। বরং সেখানে চওড়া হয়ে উঠেছিল আত্মীয়স্বজনের হাসি, কোলাকুলি আর খাঁটি পারিবারিক আড্ডার মেজাজ। বিশেষ করে নিজের সেতারবাদক দাদার সঙ্গে কোয়েলের প্রাণখোলা নাচের ছবি ও ভিডিও নিমেষের মধ্যে ভাইরাল হয়েছে নেটদুনিয়ায়। গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের লেডি বা রাজ্যসভার সাংসদ পদ— সব পরিচয় দূরে সরিয়ে কোয়েল সেখানে ধরা দিলেন একেবারে ঘরের চঞ্চল মেয়ের ভূমিকায়।
প্রসঙ্গত, পারিবারিক আবহে কোয়েলের এই হাসিমুখ যতই মন ভাল করুক না কেন, বাংলার রাজনৈতিক মহল কিন্তু এখনও এই ধোঁয়াশাতেই বুঁদ— হঠাৎ কী এমন হল যে সাংসদ হওয়ার মাত্র ৬০ দিনের মাথায় ইস্তফা দিলেন কোয়েল?
গত ফেব্রুয়ারিতে যখন তৃণমূল কংগ্রেস তাদের রাজ্যসভার প্রার্থী তালিকায় বাবুল সুপ্রিয়, সুপ্রিম কোর্টের ডাকসাইটে আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী এবং রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমারের পাশাপাশি কোয়েল মল্লিকের নাম ঘোষণা করে, তখনই চমকে গিয়েছিল রাজনৈতিক মহল। আজীবন অরাজনৈতিক থাকা কোয়েলের এই সিদ্ধান্ত ছিল ঐতিহাসিক। কিন্তু সেই ইনিংস এত দ্রুত শেষ করার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন, তা নিয়ে এখনও রহস্যের চাদর মুড়ি দিয়ে রেখেছেন অভিনেত্রী। দল বা রাজ্যসভা কর্তৃপক্ষ এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়েও জলঘোলা চলছে।
রাজনীতিতে এই টালমাটাল পরিস্থিতি চললেও, কোয়েলের ফিল্মি কেরিয়ার কিন্তু গ্রাফের শীর্ষেই রয়েছে। গত পুজোয় মুক্তি পাওয়া অরিন্দম শীলের গোয়েন্দা থ্রিলার ‘মিতিন: একটি খুনির সন্ধানে’ বক্স অফিসে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল। এমনকি ২০২৫-এর ‘স্বার্থপর’ এবং ‘সোনার কেল্লায় যকের ধন’ ছবি দুটিতেও তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
আপাতত নেটিজেন আর রাজনৈতিক বিশ্লেষক— দুই শিবিরেরই চোখ এখন বিমানবন্দরের দিকে। মার্কিন মুলুকের বিয়ের উৎসব শেষ করে ঘরের মেয়ে যখন কলকাতায় পা রাখবেন, তখন এই আকস্মিক পদত্যাগ নিয়ে তিনি নিজে মুখ খোলেন কি না, সেটাই এখন দেখার।















