বাংলা বিনোদন জগতের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক গর্বের মুহূর্ত। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় ও সিনেমার প্রতি নিষ্ঠাবান অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হতে চলেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যাঁর নাম শুধু তারকা হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় হিসেবেই উচ্চারিত হয়।
শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়জীবন শুরু হলেও নব্বইয়ের দশকে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পরই তিনি হয়ে ওঠেন টালিগঞ্জের বাণিজ্যিক ছবির মুখ। রোমান্টিক হোক বা অ্যাকশন, পারিবারিক আবেগ কিংবা সামাজিক বাস্তবতা - সব ধরনের চরিত্রে অনায়াস স্বচ্ছন্দ্যই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।‘অমর সঙ্গী’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’, ‘প্রতিবাদ’-এর মতো বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি ‘উৎসব’, ‘চোখের বালি’, ‘দোসর’, ‘মনের মানুষ’, ‘জাতিস্মর’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় বাংলা সিনেমাকে দিয়েছে এক নতুন ভাষা।বিশেষ করে ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে তাঁর কাজ বাণিজ্যিক নায়ক প্রসেনজিতকে রূপান্তরিত করেছে সংবেদনশীল, গভীর অভিনেতায়, যা তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম বড় মাইলফলক।

পদ্মশ্রী ঘোষণার পর সমাজমাধ্যমে ‘কালরাত্রি ২’ ওয়েব সিরিজ খ্যাত পরিচালক অয়ন চক্রবর্তীর একটি পোস্ট নতুন করে আলো ফেলেছে মানুষ ও শিল্পী প্রসেনজিতের এক কমচর্চিত দিকের উপর। ‘কালরাত্রি ২’-এর পরিচালক নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরেছেন, কীভাবে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং সহশিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা বরাবরই প্রসেনজিতের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফেসবুকের দেওয়ালে করা পরিচালকের পোস্ট থেকেই জানা গেল, একটি বড় ইভেন্টে, যেখানে অন্যদের অবহেলা ও অনিয়ম চোখে পড়ছিল, সেখানে একজন অতিথি হয়েও মঞ্চের কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন প্রসেনজিৎ। আবার শিল্পীর নাম খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন আনপ্রফেশনাল আচরণ নিয়ে। সেই সঙ্গে দোষ নিজের কাঁধে নেওয়া সহকর্মীকেও সম্মান জানাতে ভোলেননি।

গোটা ঘটনাটা খানিক এরকম। অয়ন চক্রবর্তী লিখেছেন, “...মনে হল, আমি হেন ক্ষুদ্র মানুষেরও প্রসেনজিৎকে নিয়ে যে কিছু ভিন্নতর অভিজ্ঞতা আছে তা কোথাও লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন। এরকম অভিজ্ঞতা আমার জ্ঞানতই বেশ কয়েকজনের আছে, কিন্তু তাঁদের লিখতে দেখছি না। যাই হোক, মাত্র তিনটে অভিজ্ঞতা লিখব, আমার ধারণা সেগুলোই একটা মানুষ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা গড়ে দিতে সক্ষম।
অভিজ্ঞতা ১ : তখন আমার নেহাতই তরুণ বয়স। একটা বেসরকারি বাংলা স্যাটেলাইট চ্যানেলে চাকরি করি। চ্যানেলের একটা বার্ষিক ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হচ্ছে গ্র্যারন্ড হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েটে। সেই ইভেন্ট শুট করে পরে চ্যানেলে সম্প্রচারিতও হবে। আমি ঐ শুটিংয়ের পরিচালক। ইভেন্টের সঞ্চালনার দায়িত্বে এক জনপ্রিয় অভিনেত্রী। কথা ছিল ইভেন্টের আগের দিন তিনি চ্যানেলের অফিসে এসে সঞ্চালনার পুরো স্ক্রিপ্ট নেবেন ও মহড়াও হবে। তিনি এলেন না, ফোন এল যে তিনি অন্য কোনও এক ইভেন্টে আটকে পড়েছেন। জানতে চাইলাম স্ক্রিপ্ট তাঁর বাড়িতে পাঠিয়ে দেব কিনা, উত্তর পেলাম প্রয়োজন নেই, পরদিন তো সন্ধে সাতটা থেকে ইভেন্ট, তিনি দুপুর দুটোয় গ্র্যােন্ডে চলে আসবেন, স্ক্রিপ্ট পড়বেন ইত্যাদি। পরদিন সন্ধে ছ'টা। তখনও এসে পৌঁছননি সেই অভিনেত্রী। এদিকে ততক্ষণে সাজঘরে এসে বসে পড়েছেন প্রসেনজিৎ। প্রসেনজিৎ সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ ঐ ইভেন্টে কয়েকজনের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন আর সামান্য কিছু কথা বলবেন। প্রসেনজিৎ দেখতে এসেছেন কোথা দিয়ে মঞ্চে যাবেন, কী বলবেন সেসব।
অভিজ্ঞতা ২ : ঐদিনই, ঐ ইভেন্টেই, অবশেষে সন্ধে সাড়ে ছ'টা নাগাদ এলেন অভিনেত্রী। এসেই মেক আপে বসে গেলেন, বসতেই হত। বসে তিনি আমাকে ডেকে বললেন, "আমি মেক আপ নিতে নিতে তুমি আমার কানের কাছে স্ক্রিপ্টটা পড়তে থাকো, তাহলেই হয়ে যাবে।" ঐ ঘরেই বসেছিলেন প্রসেনজিৎ। তিনি আমাকে বললেন, “আপনি কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি, আপনারা ওর সঙ্গে আগে স্ক্রিপ্ট রিহার্স করেননি কেন? এখন ওর পারফরম্যান্স খারাপ হলে নাম খারাপ হবে কার?" আমি কিছু বলার আগেই প্রকৃতই সৎ সেই অভিনেত্রী বললেন, "না না বুম্বাদা, ওদের দোষ নেই, ওদের বোকো না। আমিই একদম সময় দিতে পারিনি!" প্রসেনজিৎ একটুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নীচু করে বললেন, ‘আমাকে মাফ করবেন, আমি আপনার টেরিটোরিতে ইনট্রুড করছি, কিন্তু এই যে (এখানে অভিনেত্রীর নাম বলেছিলেন), এই তোমাদের মতো কয়েকজনের আনপ্রফেশনালিজমের জন্য আমাদের ইন্ডাস্ট্রির নাম খারাপ হয়।’”
অভিজ্ঞতা ৩ : প্রসেনজিতের প্রযোজনা সংস্থা তখন একটা বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলের জন্য কিছু ছবি তৈরির বরাত পেয়েছে। অল্প বাজেটের ছবি। কিন্তু চ্যানেল কর্তৃপক্ষ আর প্রসেনজিৎ চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন যে অল্প বাজেটেই বিষয়বৈচিত্রে মুগ্ধ করতে হবে দর্শকদের। সেই সময়ে দেখেছি এক একদিনে গড়ে ১০-১২ ঘন্টা করে নিরন্তর স্ক্রিপ্ট শুনে যাচ্ছেন প্রসেনজিৎ, নতুন সব পরিচালক (কারণ ঐ বাজেটে প্রতিষ্ঠিত পরিচালকরা খুব একটা উৎসাহিত হবেন না), তাঁদের মতামত পরম আগ্রহভরে শুনছেন, নিজের মত দিচ্ছেন, প্রত্যেকটা ছবির এডিট খুঁটিয়ে দেখছেন, আর আমি অবাক হয়ে লক্ষ করছি একজন মানুষের সিনেমা নামক একটা শিল্পের প্রতি কী অপরিসীম ভালোবাসা!
প্রসেনজিৎ মানুষ, মানুষমাত্রেরই দোষত্রুটি থাকে, সীমাবদ্ধতা থাকে, প্রসেনজিতেরও নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সঙ্গে এই কঠোর ডিসিপ্লিন আর সিনেমার প্রতি গভীর নিষ্ঠাও আছে। নয়তো একজন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় হয়ে থেকে যেতে পারেন না।”
অন্যদিকে, শুধু বাংলা নয়, হিন্দি ছবিতেও প্রসেনজিৎ নিজের দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। পাশাপাশি তিনি প্রযোজক হিসাবেও বাংলা সিনেমাকে সমর্থন করেছেন এবং নতুন প্রতিভাদের সুযোগ করে দিয়েছেন। টেলিভিশন ও ওয়েব সিরিজের মাধ্যমেও সমসাময়িক বিনোদন জগতের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন প্রসেনজিৎ।
