পর্দা কাঁপানো কমেডির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক জাদুকর। নাম তাঁর জনি লিভার। হাসির খোরাক জোগানোর বাইরেও তিনি যে একজন দারুণ পারফর্মার, তা কারোরই অজানা নয়। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, নয়ের দশকের শুরু দিকে যখন পুরো ভারত মাইকেল জ্যাকসনকে ঠিকমতো চিনত না, তখনই ভারতের মাটিতে পপ সম্রাটের সিগনেচার ডান্স স্টেপ পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন এই কৌতুকশিল্পী? নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত বায়োপিক ‘মাইকেল’-এর উন্মাদনার মাঝেই সম্প্রতি দেওয়া এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে জনি লিভার শেয়ার করেছেন তাঁর জীবনের এমন কিছু অজানা অধ্যায়, যা এক কথায় অভাবনীয়।
সময়টা তখন আটের দশকের শেষ বা নয়ের দশকের শুরু। ভারতে পপ মিউজিক তখন সবেমাত্র প্রবেশ করছে, আর মাইকেল জ্যাকসন নামটি তো ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে রীতিমতো অচেনা এক অধ্যায়। জনি লিভার তখন একটি বাসে সফর করছিলেন। হঠাৎ ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে শুরু করে একটি গান, যার সুর আর অনন্য ছন্দ তাঁর হৃদয়ে এক অদ্ভুত আলোড়ন তোলে। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে তিনি বাসের সহযাত্রীদের একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "কে গেয়েছে এই গানটা? আমি এই ক্যাসেটটি কিনতে চাই।" সহযাত্রীটি গান শুনে জনি লিভারের মুগ্ধতা দেখে তাঁর হাতে ক্যাসেটটি তুলে দিয়ে বলেছিলেন, "আপনার এতই পছন্দ হয়েছে? তাহলে এটাই রাখুন।"
কিন্তু সেই ক্যাসেট নিয়ে বাড়ি ফিরে এক মজার কাণ্ড ঘটেছিল। জনি লিভার বারবার শোনার পরও ভেবেছিলেন গানটি বোধহয় কোনো নারী কণ্ঠের। পরবর্তীতে যখন তিনি জানতে পারেন, এটি একজন পুরুষের কণ্ঠ, তখন তিনি রীতিমতো অবাক হয়েছিলেন। এরপর যখন মাইকেল জ্যাকসনের ‘থ্রিলার’ অ্যালবাম বাজারে আসে এবং ‘ওয়ানা বি স্টার্টিং সামথিং’-এর মতো গানগুলো বিশ্বজুড়ে ঝড় তোলে, তখন পুরো বিশ্ব মেতে ওঠে জ্যাকসন জ্বরে। জনি লিভারও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না।
জ্যাকসনের নাচ দেখার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও, সেই সময়ে জনি লিভারের নিজের বাড়িতে কোনও ভিডিও প্লেয়ার ছিল না। কিন্তু তিনি দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি সোজা ছুটে যান মুম্বইয়ের ভারসোভায় এক বন্ধুর বাড়িতে, শুধুমাত্র পর্দায় জ্যাকসনের সিগনেচার ডান্স স্টেপ দেখার জন্য। তন্ন তন্ন করে নাচের ধরনটি আয়ত্ত করার পর যা ঘটে, তা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মাইলফলক। জনি লিভার আজও গর্বের সঙ্গে বলেন, "আমেরিকায় কেউ মাইকেল জ্যাকসনকে কপি করার আগেই, জনি লিভার প্রথম তাঁকে নকল করেছিলেন।"
নব্বইয়ের দশকে ‘মহাকাল’ (১৯৯৪) কিংবা ‘বারুদ’ (১৯৯৮)-এর মতো ছবিতে যখন জনি লিভার মাইকেল জ্যাকসনের স্টাইল ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা দর্শকদের এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, তা প্রতিটি দর্শকের স্মৃতিতে আজও অমলিন। এমনকী ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চে জনি লিভারের মাইকেল জ্যাকসন অ্যাক্ট সেসময় এক কালজয়ী মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল।
আজ যখন পপ সম্রাটের জীবন নিয়ে ‘মাইকেল’ ছবিটি বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করছে, তখন জনি লিভারের এই স্মৃতিচারণ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও ‘মাইকেল’ বায়োপিকটি মুক্তির পর সমালোচকদের কাছ থেকে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছে, তবুও পপ সম্রাটের প্রতি জনি লিভারের সেই অমলিন আকর্ষণ আজও অটুট। জনি লিভার জানিয়েছেন যে, তাঁর সন্তানেরা ইতিমধ্যে ছবিটি হলে গিয়ে দেখে দারুণ উপভোগ করেছে। তবে তিনি নিজেও খুব শীঘ্রই ছবিটি দেখার অপেক্ষায় আছেন।
জনি লিভার-এর এই নস্টালজিয়া আবারও মনে করিয়ে দেয়, শিল্পের কোনও সীমানা হয় না, আর মহান শিল্পীরা একে অপরের কাজকে এভাবেই নিজেদের কাজের ভেতর দিয়ে অমর করে রাখেন।















