আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রায় তিন সপ্তাহব্যাপী ইরানে মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অব্য়াহত। এর মাঝেই খামেনির বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের তরফে। প্রকাশ্য়ে প্রতিবাদীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্বাভাবিকভাবেই প্রেসিডেন্টকে 'সম্ভাব্য পরিত্রাতা' বলে মনে করেছিলেন ইরানিরা। কিন্তু, সময় এগোতেই সেই ভরসায় চিড় ধরেছে। বিক্ষোভকারীরা ক্রমশই উপলব্ধি করছেন যে, ট্রাম্পের মুখের কথা ও কাজে বিস্তর ফারাক রয়েছে। ফলে ক্ষোভ বাড়ছে ইরানিদের।  

অশান্তির শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে ইরানি বিক্ষোভকারীদের উৎসাহিত করেছিলেন। তেহরানকে সতর্ক করেছিলেন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণা করেছিলেন যে "সাহায্য আসছে" এবং পরে সতর্ক করেন যে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ক্ষতি করা হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র "প্রস্তুত ও উদ্যত" আছে। তখন অনেক ইরানি এই কথাগুলোকে সুনির্দিষ্ট সমর্থনের সংকল্প, এমনকী সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতিশ্রুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

ফলে আরও উৎসাহে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামেন। বিক্ষোভকারীদের দমাতে মরিয়া হয় ইরানি প্রশাসনও। পরিচিত কৌশল অবলম্বন করেই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা এবং প্রাণঘাতী হিংসার ব্যবহার হয়। সারা দেশ থেকে আসা বিবরণীতে স্নাইপারের গুলি, মেশিনগানের হামলা এবং বিপুল সংখ্যক মৃত্যু ও নিখোঁজের কথা বলা হয়েছে। চরম সময়েই পেন্টাগন ইরান সংলগ্ন অঞ্চলের একটি প্রধান মার্কিন ঘাঁটি থেকে কিছু অপ্রয়োজনীয় কর্মীকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এই বিষয়টিকে ব্যাপকভাবে সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবেই দেখা হয়েছিল।

ঠিক এই সময়েই ট্রাম্পের ব্যবহারে বদল লক্ষ্য করেন ইরানিরা। অবস্থান পরিবর্তন ঘটে। ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, ইরানের নেতৃত্ব তাঁকে আশ্বস্ত করেছে যে, তারা হত্যা ও মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করবে। প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দেন যে, প্রত্যাশিত মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ আর করা হবে না। যে বিক্ষোভকারীরা ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপ করবে এই বিশ্বাসে নিজেদের জীবন বিপন্ন করেছিল, তাদের কাছে এই ঘোষণাটি ছিল একটা বড় সধাক্কা।

বিক্ষোভের হতাহতের সংখ্যার কথা উল্লেখ করে তেহরানের একজন ব্যবসায়ী টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, "এই ১৫,০০০ মৃত্যুর জন্য ট্রাম্প দায়ী। কারণ অনেক বিক্ষোভকারী তাঁর ' মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত ও উদ্যত' পোস্টটি দেখে রাস্তায় নেমেছিল। আমেরিকা নিশ্চয়ই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। মনে হচ্ছে যে, তিনি (ট্রাম্প) 'এই চুক্তি করেই ইরানিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন'।" 

দেশ ছাড়ার পর সাক্ষাৎকার দেওয়া একজন ইরানি বলেন, "তিনি (ট্রাম্প) যখন বললেন যে, ইরানি কর্তৃপক্ষ তাঁকে জানিয়েছে আর কোনও হত্যা ও মৃত্যুদণ্ড হবে না, তখন সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সবাই ক্ষুব্ধ। সকলেই শুধু বলছিল যে, আমাদের খোরাক হিসাবে হিসেবে ব্যবহার করা হল। ইরানিরা মনে করে যে তাদের সঙ্গে খেলা করা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমাদের বোকা বানিয়েছেন, প্রতারণা করেছেন।"

যারা ট্রাম্পের কথায় প্রভাবিত হয়েছিলেন, তাদের জন্য মানসিক আঘাতটি ছিল খুব বেশি। তেহরানের একজন ব্যবসায়ী বলেন, "ট্রাম্প আরও খারাপ। সে সব কিছু নষ্ট করে দিয়েছে। সে আমাদের পায়ের নীচ থেকে মাটি সরিয়ে নিয়েছে।" তেহরানের আরেকজন নাগরিক টাইম ম্যাগাজিন-কে বলেন, "সে শুধু বাইরে থেকেই কাপুরুষ নয়, ভেতর থেকেও কাপুরুষ।" বিক্ষোভকারী ইরানিদের মতে, ট্রাম্পের বিবৃতিগুলো এমন প্রত্যাশা তৈরি করেছিল যা সরাসরি মানুষকে বিক্ষোভে অংশ নিতে উৎসাহিত করেছিল, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সেই সমর্থন উধাও হয়ে যায়। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে, বন্ধ ঘরে একটি চুক্তি হয়েছিল। এরপরই ট্রাম্পের উদাসীনতা প্রকট হয়।

তেহরানের এক মহিলা বাসিন্দার কথায়, "আমি সব আশা হারিয়ে ফেলেছি। ট্রাম্প কিছুই করবেন না। কেন করবেন? তিনি আমাদের নিয়ে ভাবে না।"

ইরানের কর্মকর্তারা যখন প্রকাশ্যে ট্রাম্পের দাবি নিয়ে উপহাস করেন এবং বিক্ষোভকারীদের  আরও দমন-পীড়নের হুঁশিয়ারি দেন, তখন ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। বিক্ষোভ দমন করে আড়ালে ঠেলে দেওয়ার পর, অনেক ইরানি এখন মনে করেন যে- একটা বাহ্যিক প্রতিশ্রুতির উপর বিশ্বাস করার জন্য তাদের মূল্য চোখাতে হচ্ছে, যা কখনওই পূরণ হবে না।  

একটি ছোট গোষ্ঠী এখনও যুক্তি দিচ্ছে যে, ট্রাম্পের পিছু হটা কৌশলগত হতে পারে। তেহরানের একজন ই্জিনিয়র বলেন, "আসলে ট্রাম্প নীরব থেকে ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে ধোঁকা দিচ্ছে।" জিরাবের একজন বাসিন্দা বলেন, "এই মুহূর্তে অভ্যুত্থানটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। আমি জানি না আর কখনও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব কিনা।"

ইরানে সর্বশেষ বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল ডিসেম্বরের শেষের দিকে। রিয়ালের অবমূল্যায়ন, ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি এবং আর্থিক অব্যবস্থাপনা-সহ অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে শুরু হয়েছিল। যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক বিষয়গুলিতে নজর থাকলেও, বিক্ষোভ রাজনৈতিক সংস্কার এবং সরকারের পরিবর্তনের দাবিতেও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর জানুয়ারিতে, ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভী এবং অন্যান্য বিরোধী গোষ্ঠীর আহ্বানের পর, দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।