কাগজে-কলমে নেটফ্লিক্সের এই ছবির সমীকরণ থেকে শুরু করে চমক- এক কথায় ছিল নিখুঁত। একদিকে সানি দেওল, অন্যদিকে অক্ষয় খান্না— দুই শক্তিশালী অভিনেতাকে নিয়ে কোর্টরুম থ্রিলার। কিন্তু বড় বড় প্রতিশ্রুতির আড়ালে শেষ পর্যন্ত 'ইক্কা' হয়ে উঠেছে হতাশার আরেক নাম। 

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন সোমা মিত্তল (আকাঙ্ক্ষা রঞ্জন কাপুর)। এক রাতে প্রভাবশালী রাজনীতিকের ছেলে শৌর্যমান গৌরের (অক্ষয় খান্না) সঙ্গে পার্টি করার পরের দৃশ্যেই তাঁকে রাস্তায় রক্তাক্ত এবং অচৈতন্য অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে শৌর্যমান গ্রেফতার হয়। কিন্তু আদালতে নিজের হয়ে লড়ার জন্য সে বেছে নেয় দেশের অন্যতম সেরা আইনজীবী অর্জুন মেহরাকে (সানি দেওল), যিনি 'ইক্কা' নামেও বহুল পরিচিত।

প্রথমে এই মামলা নিতে অস্বীকার করেন অর্জুন মেহরা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই দিনই তাঁর মেয়ের শেষ পর্যায়ের ক্যানসার ধরা পড়ে এবং একমাত্র উপযুক্ত বোন ম্যারো ডোনার হিসেবে সামনে আসে শৌর্যমানের নাম। সেখান থেকেই শুরু হয় ছবির মূল সংঘাত। চাপানউতোর। 
শুনতে রোমাঞ্চকর লাগলেও ছবির চিত্রনাট্যে পরপর এমন সব ঘটনা সুন্দরভাবে এগোতে থাকে যা থ্রিলারের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই একেক সময়  প্রশ্নের মুখে ফেলে। এতো সহজ সবকিছু হয় নাকি! যেন ভাতের পর ডাল, তারপর ঝুরি আলুভাজা, তারপর কষা মাংস, এরপর একটু চাটনি...  একটি বুদ্ধিদীপ্ত কোর্টরুম থ্রিলারের বদলে 'ইক্কা' শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে পরিচিত ফর্মুলার উপর দাঁড়ানো ক্লাবঘরের এক মজলিশি গপ্প।

পরিচালক সিদ্ধার্থ পি. মালহোত্রা যেন আদালতের লড়াইয়ের চেয়ে বেশি আগ্রহী ছবির দুই প্রধান চরিত্রের তারকাসুলভ উপস্থিতি তুলে ধরতে। মানে পর্দায় কার 'অরা' কত বড়! ফলে মামলার টানটান উত্তেজনা বারবার হারিয়ে যায়। বারবার। ঠিক সেই কারণেই অক্ষয় খান্নার কখনও ঠান্ডা শীতল অভিব্যক্তি আর সানি দেওলের চেনা তর্জন-গর্জন, এইসব মুহূর্তকে দিয়েই ছবির অধিকাংশ দৃশ্যর আবহ তৈরি হয়েছে। টেনে রাখতে হয়েছে দর্শকের চোখ। 


অক্ষয় খান্না বরাবরের মতোই দারুণ। কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্র 'শৌর্যমান'-এর মধ্যে 'ধুরন্ধর'-এর রেহমান ডাকাতের ছায়া এতটাই স্পষ্ট যে খানিক হতাশ হতে হয়। তবে তাই বলে মোটেই একঘেয়ে নয়।  এমনকি খুনের মামলার আসামি হিসেবে আদালতে স্লো-মোশন এন্ট্রি ও নায়কোচিত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও ছবির বাজারচলতি মশলার ঝাঁজ আরও একটু বাড়ায়। তবে সেই গন্ধ পেতে কিন্তু দিব্যি লাগে। কারণ ওই যে 'অরা'। 

সানি দেওলের চরিত্র সম্পর্কে এই ছবিতে সবার খালি বলেন তিনি নাকি অসাধারণ আইনজীবী। কিন্তু সেই মেধার হাতেগরম প্রমাণ দর্শক খুব কমই দেখতে পান। যদিও তাঁর চোখ পাকিয়ে জোর গলায় দেওয়া যুক্তিগুলো যেন উনুন থেকে বের হওয়া গরম-গরম রুটি। এর উপর দু'হাত ঝুলিয়ে খানিক ঝুঁকে গটগট করে হেঁটে চলা - সব মিলিয়ে দাপটে ঠাসা। তার মধ্যে এত আবেগী! দেশের এত বড় উকিলের এত আবেগপ্রবণ হলে চলবে কী করে? এদিকে সানিকে আবার অসুস্থ মেয়ের বাবা হিসেবে আবেগঘন মুহূর্তগুলোতেও তিনি একেবারেই প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারেননি। বরং অনেক আড়ষ্ট। তবে শেষমেশ তিনি যে সানি দেওল, তাই নামের বীর্য প্রমাণ করতে ক্লাইম্যাক্সে যা করলেন তা একজন ভারতীয় উকিল করতে পারেন কি না এভাবে - সে প্রশ্ন তোলা অপ্রয়োজনীয়। 

অন্যদিকে দিয়া মির্জা আবারও এক অসহায় মায়ের চরিত্রে। চরিত্রটি নতুন কিছু না হলেও তাঁর স্বাভাবিক অভিনয় সেটিকে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। তিলোত্তমা সোমকে প্রসিকিউশন আইনজীবীর ভূমিকায় কার্যত অপচয় করা হয়েছে। তবে তিনি চেষ্টা করেছেন আপ্রাণ। কিন্তু ওই যে চিত্রনাট্যে সুযোগ না থাকলে তিনি কী-ই বা করবেন। তবে যতটুকু পেরেছেন তিলোত্তমা করেছেন। একজন বাঙালি জুনিয়র উকিল হিসেবে সানির মতো এমন দোর্দণ্ডপ্রতাপ উকিলের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিযোগিতা, দ্বিধা-দ্বন্দ ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছেন তিনি। ওদিকে, গল্পের মূল চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও আকাঙ্ক্ষা রঞ্জন কাপুরের জন্য চিত্রনাট্যে তেমন কিছুই রাখেননি নির্মাতারা। কেন রাখেননি? জানে শুধু পরিচালক। 


সব মিলিয়ে 'ইক্কা' এমন একটি কোর্টরুম থ্রিলার, যার সম্ভাবনা ছিল অনেক, অনেক বড়। কিন্তু দুর্বল চিত্রনাট্য, অতিরিক্ত সুবিধাজনক প্লট টুইস্ট এবং তারকাকেন্দ্রিক উপস্থাপনাকে বড় করে দেখানোর প্রবণতার কারণে এ ছবি কখনওই সেই বিরাট উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। তবে একবার কিন্তু দেখতেই পারেন। মন্দ লাগবে না।