গত কয়েকদিন ধরে অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে ঘিরে চলা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোলিং, বডি শেমিং ও এজ শেমিংয়ের বিরুদ্ধে সরব হলেন প্রয়াত অভিনেতা তাপস পালের স্ত্রী নন্দিনী পাল। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে ফেসবুকে এক আবেগঘন ও তীব্র ভাষার পোস্টে তিনি ঋতুপর্ণার পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কখনওই কাউকে অপমান, হেনস্থা বা অসম্মান করার লাইসেন্স হতে পারে না।
নন্দিনী লিখেছেন, এতদিন চুপ থাকলেও এবার আর নীরব থাকা সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, কারও পোশাক পছন্দ না-হতেই পারে, সেটি ব্যক্তিগত মতামত। কিন্তু সেই অজুহাতে একজন মহিলাকে কটূক্তি করা, বয়স নিয়ে বিদ্রুপ করা, চেহারা নিয়ে অপমান করা বা তাঁকে প্রকাশ্যে হেনস্থার লক্ষ্যবস্তু বানানো কোনওভাবেই সমালোচনা নয়, বরং তা নিছক অনলাইন হেনস্থা!
পোস্টে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, বয়স বাড়া কবে থেকে অপমানের বিষয় হয়ে উঠল? তাঁর মতে, বয়স বাড়া সৌভাগ্যের বিষয়, আর সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মানুষের অধিকার। একজন নারী কী পরবেন বা তাঁর বয়স কত, তার ভিত্তিতে তাঁকে অপমান করার কোনও অধিকার কারও নেই।
ঋতুপর্ণার সঙ্গে তিন দশকেরও বেশি সময়ের ব্যক্তিগত পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে নন্দিনী জানান, তিনি কাছ থেকে এই অভিনেত্রীর মানবিকতা, সহমর্মিতা ও উদারতা দেখেছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও বহু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন ঋতুপর্ণা। অথচ যাঁরা ভুয়ো পরিচয়ের আড়ালে বসে তাঁকে নিয়ে বিচার করছেন, তাঁরা অভিনেত্রীর জীবন, সংগ্রাম বা ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
নন্দিনীর আরও অভিযোগ, বর্তমানে অনেকেই অন্যের অপমানকে 'কনটেন্ট'-এ পরিণত করে ভিউ, লাইক এবং অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করছেন। তাঁর প্রশ্ন, এটাই কি এখন সমাজের গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি? অন্যকে অপমান করে জনপ্রিয়তা অর্জনের মধ্যে কোনও সৃজনশীলতা বা সাহস নেই, রয়েছে শুধুই নিষ্ঠুরতা।
ভুয়ো পরিচয়ে ট্রোল করা ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, যদি নিজেদের কথায় সত্যিই বিশ্বাস থাকে, তাহলে মুখ লুকিয়ে থাকার প্রয়োজন কেন? তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার গোপন পরিচয় কখনওই লাগাতার অপমান, হুমকি বা মানহানির ঢাল হতে পারে না।
আইনের প্রসঙ্গও টেনে আনেন নন্দিনী। তিনি মনে করেন, যখন অনলাইন আচরণ সীমা ছাড়িয়ে ধারাবাহিক হেনস্থা, বডি শেমিং, এজ শেমিং, ভয় দেখানো বা মানহানিকর আক্রমণে পরিণত হয়, তখন তাকে 'এ তো সোশ্যাল মিডিয়া' বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া উচিত।
একইসঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির প্রতিও আবেদন জানিয়ে তিনি লেখেন, নিজেদের কমিউনিটি গাইডলাইন আরও কঠোরভাবে কার্যকর করা জরুরি। ঘৃণা বা অপমান কখনও ট্রেন্ড হওয়া উচিত নয়, আর অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সেই ঘৃণাকেই বাড়িয়ে তোলা আরও অনুচিত।
পোস্টের শেষে ঋতুপর্ণার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের সাফল্যের কথা স্মরণ করিয়ে নন্দিনী বলেন, কয়েকটি বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য তো দূরের কথা, হাজারো কটূক্তিও ঋতুপর্ণার আজীবনের কৃতিত্বকে মুছে দিতে পারবে না। তাঁর মতে, এই লড়াই শুধু ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে ঘিরে নয়, সেই সব নারীর জন্য, যাঁরা বয়স, চেহারা বা ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে প্রতিনিয়ত অপমানের শিকার হন।
ট্রোলারদের উদ্দেশে নন্দিনীর শেষ বার্তা, "তোমাদের মন্তব্য ঋতুপর্ণার চরিত্র নয়, বরং তোমাদের চরিত্রকেই প্রকাশ করে। একজন মানুষকে কতটা সম্মানের সঙ্গে ব্যবহার করতে পারি, সেখানেই আমাদের মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়। এবার যথেষ্ট হয়েছে। এমন সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে সমালোচনা হবে সভ্য, মতভেদ হবে সম্মানজনক, আর বিনোদনের নামে কারও মর্যাদা বলি হবে না।"
















