মঙ্গলবার বিকেলে এক বিষণ্ণ গোধূলিতে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্ল্যামার দুনিয়ার কোনও চাকচিক্য নয়, বরং নিজের আজন্ম লালিত রাজনৈতিক আদর্শ এবং সাধারণ মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়েই বিদায় নিলেন বিজয়গড়ের ‘বাবিন’। সেই শোকের আবহে যখন গোটা শহর জুড়ে কেবলই হাহাকার, তখন স্মৃতির সরণি বেয়ে জনপ্রিয় নাট্যকার-পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়ের কলমে 'মর্মান্তিক, বড্ড কষ্টের' অনুভূতির মাঝে  উঠে এল এক অন্য রাহুলের গল্প। আসলে, বিজয়গড়ের সেই ১৫ বছরের কিশোর থেকে টলিউডের ‘ফিল্মস্টার’— রাহুলের সুদীর্ঘ যাত্রাপথের সাক্ষী ছিলেন সুমন মুখোপাধ্যায়। 


সেটা নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়। দূরদর্শনের সিরিজ ‘ঢেউ’-এ অঞ্জন দত্তর ছোটবেলার চরিত্রে মানাবে এমন এক কিশোর অভিনেতা খুঁজছিলেন সুমন। কিংবদন্তি নবারুণ ভট্টাচার্যের মাধ্যমেই কিশোর রাহুলের সন্ধান পেয়েছিলেন তিনি। কারণ নবারুণ ভট্টাচার্যের নাটকের দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রাহুলের বাবা এবং মা। অঞ্জন দত্তর ছোটবেলার চরিত্রে সেই প্রথম অভিনয় বছর ১৫-র রাহুলের।


সেই লেখায় সুমন জানান, ‘চিরদিনই তুমি যে আমরা’-র আকাশছোঁয়া সাফল্যের পর রাহুল যখন জনপ্রিয় তারকা, তখনও সুমনের ফোনে তাঁর নাম সেভ ছিল ‘রাহুল ফিল্মস্টার’ হিসেবে। এ কথা শুনে রাহুল নাকি হোহো করে হেসেছিলেন। সুমন লিখলেন, “খুব নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলেও ও আমার প্রতিটি নাটক দেখত। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ দেখে আমায় যা লিখেছিল, তা স্মৃতিতে অমলিন থাকবে।”


সম্প্রতি রাহুলের পডকাস্ট ‘সহজ কথা’-য় অতিথি হিসেবে গিয়েছিলেন সুমন। সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে করে তিনি লেখেন, “ও অনেক খেটে প্রশ্নমালা তৈরি করেছিল। আমার সব কাজ ওর নখদর্পণে ছিল। এরকম আড্ডা মারার মেধাবী মানুষ এখন বড়ই কম। তাছাড়া, রাহুল বেশ কয়েক বছর নিয়মিত লেখালিখি করছিল, ওর গল্প থেকে নাটক সৃষ্টি হোল, অভিনয়ে ওকে ফিরে পাচ্ছিলাম নতুন করে, 'সহজ কথা'য় অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উঠে আসছিল।” ঠিক যখন রাহুল নিজের একটি স্বতন্ত্র স্বর খুঁজে পাচ্ছিলেন অভিনেতা ও লেখক হিসেবে, ঠিক তখনই সবটা ‘শূন্য’ করে দিয়ে তাঁর চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না পরিচালক।


রাহুলের অকাল প্রয়াণকে এদনা সেন্ট ভিনসেন্ট মিলে-র (Edna St. Vincent Millay) বিখ্যাত কবিতার পংক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন সুমন মুখোপাধ্যায়। কবির ভাষা অনুসরণ করে সুমন যা বলতে চেয়েছেন — রাহুলের জীবনটা ছিল সেই মোমবাতির মতো যা দুই প্রান্ত দিয়েই জ্বলছিল। হয়তো সেই আলো দীর্ঘস্থায়ী হলো না, কিন্তু যে ‘অপূর্ব আলো’ ও ছড়িয়ে দিয়ে গেল, তার উত্তাপ থেকে যাবে প্রতিটি বাঙালির মননে।

 

 

&t=4s