হিন্দির পাশাপাশি অসংখ্য বাংলা গান গেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে। পরিচালক বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের একাধিক ছবিতেও রয়েছে তাঁর নানান জনপ্রিয় গান। তাই আশা ভোঁসলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে খানিক শোকাচ্ছন্ন সেই সব ছবির পরিচালক। “কী বলব জানি না...আমার প্রথম ছবি 'মোহনার দিকে' সব ক'টি গান আশাজি গেয়েছিলেন। কিশোরকুমারও একটি গান গেয়েছিলেন। আমার পরিচালিত একান্ত আপন ছবির সুর দিয়েছিলেন পঞ্চমদা। বলাই বাহুল্য, সে ছবিতেও গেয়েছিলেন তিনি।  এরপর আমার পরিচালনায় কড়ি দিয়ে কিনলাম ছবিতেও আশাজি গান করেছিলেন।  তাই আশাজির চলে যাওয়ার খবরটা যখন পেলাম, ধাক্কা তো একটা লাগেই, কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হয়েছিল ইয়ে তো হোনা হি থা। এই ভাবনাটুকুকেই সম্বল করে নিজেকে সান্ত্বনা দেব। এছাড়া আর উপায় নেই। লতাজি চলে গিয়েছেন কিছুদিন আগে, আশাজি-ও চলে যাবেন সেটা জানতাম...আমরা সবাই যাব...” বলতে বলতে খানিক আনমনা বর্ষীয়ান পরিচালক। 

 

এরপর ফের বলে উঠলেন, "দেখুন, আশাজি আর নেই-এই কষ্টটা থাকবেই। এই দুঃখ থেকে মুক্তি নেই। তবে লতাজি, আশাজি এঁরা কিন্তু চিরন্তন। তবে আমার একটা দুঃখ থেকে গেল। একান্ত আপন ছাড়া পঞ্চমদাকে নিয়ে আর কোনও কাজ করতে পারিনি। তো একদিন মুম্বই গিয়েছিলাম কাজের সূত্রে। ফাঁক পেয়েই ভেবেছিলাম পঞ্চমদার সঙ্গে দেখা করে আসি। ওঁর মিউজিক রুমে হঠাৎ-ই গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। এক সময়ের পঞ্চমদার মিউজিক রুমে ঢুকতে পারা মানেই ছিল বিরাট ব্যাপার। একে তো সেই সময়ের ওরকম আধুনিক মিউজিক রুম। তার উপর বলিপাড়ার সব নক্ষত্ররা আড্ডা দিতে আসতেন বিকেলে সেখানে। তো আমি সেদিন গিয়ে দেখি, গোটা মিউজিক রুমটি ফাঁকা। আলো-আঁধারির মধ্যে একা চুপচাপ বসে রয়েছেন রাহুল দেব বর্মন! তো আমি যেতেই পঞ্চমদা ডেকে উঠলেন –‘বীরু আয়’। খানিক একথা-সেকথার পর আমার প্রতি পঞ্চমদার ক্ষোভটা বেরিয়ে এসেছিল –“হ্যাঁ রে, বীরু। তোকে আমি এত বড় হিট দিলাম। আর তুই আমাকে আর একটা ছবিও দিলি না সুর করার জন্য?'  পঞ্চমদার সেই হাহাকারটা আজও আমার কানে বাজে। আসলে, কী জানেন তো যাঁরা এক সময় উঁচুতে ওঠে তাঁদেরও পড়ে যেতে হয়। লতাজিও নিজের শেষ জীবনে নিয়ে আক্ষেপ করতেন। বলতেন, ‘সারা জীবন শ্রেষ্ঠ সব জায়গায় থেকেছি, অপূর্ব সব খাবার খেয়েছি, সর্বোচ্চ সব সম্মান পেয়েছি এবং মানুষের ভালবাসা কুড়িয়েছি...তবু শেষজীবনে কাটাতে হচ্ছে মেক হাসপাতালে এভাবে?’ আসলে, বলতে চাইছি, যাঁরা পরিণত বয়সে মৃত্যুর মুখোমুখি হন সজ্ঞানে, তাঁদের আক্ষেপ হতে বাধ্য জীবনে কত কী পেয়েছি তবু এভাবে...আশাজিরও কী সেই চিন্তা হয়েছিল? যাক গে....মন খারাপ তো তাই এসব ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আসলে, আমাদেরও তো বয়স কম হল না। সব মিইয়ে তাই ঠিক মনটা ভাল নেই একদম।”  

 

 

রবিবার মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন আশা ভোঁসলে। চিকিৎসক ড. প্রতীত সামদানি এই প্রবীণ শিল্পীর প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেছেন।শনিবার, ১১ এপ্রিল দুপুরের দিকে হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হন বর্ষীয়ান এই গায়িকা। তড়িঘড়ি তাঁকে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে আইসিইউ-তে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। অভিজ্ঞ কার্ডিওলজিস্টদের একটি বিশেষজ্ঞ দল আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও শেষরক্ষা হলো না। ১২ এপ্রিল সকালে সুরের মায়া কাটিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ‘আশা তাই’।লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমার, মহম্মদ রফি এবং মুকেশ—যে কণ্ঠস্বরগুলো গত অর্ধশতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাঁদের মধ্যে শেষ প্রতিনিধি হিসেবে প্রদীপের আলো ধরে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু রবিবার সকালে মুম্বইয়ের আকাশে শোকের মেঘ ঘনিয়ে এল। চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন হলেন ‘আশা তাই’। আর তাঁর চলে যাওয়ার সঙ্গেই ভারতীয় সঙ্গীতের সেই অবিস্মরণীয় স্বর্ণযুগের ওপর চিরতরে পর্দা নেমে এল।


হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাতি সহ একাধিক ভাষায় হাজার হাজার গান গেয়েছেন আশা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে শুরু করে পপ, গজল বা লোকসঙ্গীত—প্রতিটি ঘরানায় তাঁর দখল ছিল প্রশ্নাতীত। বিশেষ করে সঙ্গীত পরিচালক আর.ডি. বর্মনের সঙ্গে তাঁর কালজয়ী জুটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। বাংলা আধুনিক গান এবং সিনেমার গানেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।


আগামী সোমবার বিকেল ৪টেয় মুম্বইয়ের শিবাজী পার্কে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আশা ভোঁসলের শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বা তাঁর প্রতিনিধিসহ বিনোদন ও রাজনৈতিক জগতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত থাকতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।