টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে গত কয়েক বছর ধরে চলে আসা পরিচালক বনাম টেকনিশিয়ানদের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের ইতিহাস কারোর অজানা নয়। ফেডারেশনের তৎকালীন দাপুটে সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস -এর অঙ্গুলিহেলনে যেভাবে একের পর এক প্রথম সারির পরিচালককে কোণঠাসা করা হয়েছিল, টেকনিশিয়ানদের দিয়ে ‘ফরমান’ জারি করিয়ে কাজ বন্ধ করা হয়েছিল— তাতে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন প্রযোজকেরা। স্বরূপ বিশ্বাসের সেই ‘স্বৈরাচারী’ নীতির বিরুদ্ধে মাথা নোয়াতে না চাওয়ায় বহু পরিচালক টলিউডে ব্রাত্য হয়ে গিয়েছিলেন, হারিয়েছিলেন কাজ। এমনকি, প্রায় নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল পরিচালকদের অন্যতম প্রধান সংগঠন ‘ডিরেক্টর্স অ্যাসোসিয়েশন অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’ (DAEI)-কে।
কিন্তু ২০২৬-এর জুন মাসে এসে টলিউডের সেই চেনা ক্ষমতার সমীকরণে এক মস্ত বড় ওলটপালট ঘটে গেল। বৃহস্পতিবার টলিউডের নতুন প্রশাসনিক সমীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ তথা নেত্রী পাপিয়া অধিকারী-র সঙ্গে এক হাই-ভোল্টেজ বৈঠকে বসেন ডিরেক্টর্স অ্যাসোসিয়েশন অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া-র সদস্যরা। আর সেই বৈঠকের পরই টলিউডের আকাশে জমে থাকা কালো মেঘ কাটার ইঙ্গিত মিলল।
পাপিয়া অধিকারীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠকের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন ইন্ডাস্ট্রির প্রবীণ ও স্পষ্টবক্তা পরিচালকেরা। ‘নীল নির্জন’ বা ‘অ্যাবাউট মি’ খ্যাত খ্যাতনামা পরিচালক সুব্রত সেন বিশদে কিছু না বললেও, ওঁর কথায় দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটার সুর পাওয়া গেছে।
সুব্রত সেনের কথায়, “আজ বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। চেষ্টা চলছে যাতে ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটা সুনির্দিষ্ট ‘ফিল্ম পলিসি’ তৈরি করা হয়। আর সবথেকে বড় কথা— ফেডারেশন থেকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ‘ডিরেক্টর্স অ্যাসোসিয়েশন অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’-কে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার আর তা হবে না। পাপিয়া অধিকারী আমাদের স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে সব কটি গিল্ডই সসম্মানে থাকবে। তবে হ্যাঁ, এখনও কিছু আলোচনা বাকি আছে। আমি যেহেতু এখন সংগঠনের সভাপতি নই, তাই এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারব না।”
সুব্রত সেন মুখে কুলুপ আঁটলেও, টালিগঞ্জের ভেতরের এক নির্ভরযোগ্য সূত্র মারফত জানা গেছে এক বিস্ফোরক তথ্য। স্বরূপ বিশ্বাসের ক্রমাগত মানসিক চাপ, কাজের ক্ষেত্রে নোংরা রাজনীতি এবং ‘ব্ল্যাকমেইল’-এর ভয়ে একসময় যে সমস্ত স্বাধীনচেতা পরিচালক ডিরেক্টর্স অ্যাসোসিয়েশন অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, পাপিয়া অধিকারী ওঁরদের সবাইকে আবার সসম্মানে নিজেদের পুরনো গিল্ডে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
টলিউডের একাংশের মতে, ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর একচেটিয়া ক্ষমতা এবং দাদাগিরি-জুয়াচুরি এবার শেষ হতে চলেছে। পরিচালকদের এই জয় স্রেফ একটি সংগঠনের জয় নয়, বরং তা টলিউডে সৃজনশীল স্বাধীনতার এক নতুন ভোরের সূচনা। এখন পাপিয়া অধিকারীর এই আশ্বাসের পর টালিগঞ্জের কোণঠাসা পরিচালকেরা আবার মুক্ত বাতাসে কেরিয়ারের ‘অ্যাকশন’ বলতে পারেন কিনা, সেটাই দেখার।















