যুদ্ধের দামামা যখন বিশ্বজুড়ে, তখন সেই আদিম ধ্বংসলীলার উত্তর খুঁজতে আবারও মহাকাব্যের শরণাপন্ন নাট্যকার দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। বুদ্ধদেব বসুর কালজয়ী কাব্যনাট্য ‘প্রথম পার্থ’ নিয়ে মঞ্চে ফিরছেন তিনি। তবে এটি কেবল কুরুক্ষেত্রের গল্প নয়, বরং ইরান-আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অশান্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ থামানোর এক চিরকালীন আকুলতা। আগামী ১৩ মে অ্যাকাডেমিতে ‘মুখোমুখি নাট্য উৎসবে’ প্রথমবার মঞ্চস্থ হতে চলেছে এই নাটক।


বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্ব দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। অবশ্য পরিচালকের আসন ছেড়ে মাঝেমধ্যেই তিনি উঠে আসেন মঞ্চে। তবে এবারে ফের একবার নিজের পরিচালনায় নাটক প্রথম পার্থ নিয়ে ফিরছেন দেবেশ। বুদ্ধদেব বসু রচিত এই বিখ্যাত কাব্যনাট্যতে প্রধান ভূমিকায় দেখা যাবে অর্ণ মুখোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত, অভ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামসিশ পাহাড়ি, সুকন্যা চক্রবর্তী ও সেঁজুতি মুখোপাধ্যায়কে।  


 বিশ্বের দীর্ঘতম মহাকাব্য মহাভারত-এর অষ্টম পর্ব ‘কর্ণ পর্ব’ থেকে নেওয়া খণ্ডাংশ—সুনির্দিষ্টভাবে কর্ণের মাতৃ ও জন্ম পরিচয়ের গুপ্ত তথ্য প্রকাশ এবং তাকে তারই সহোদর পঞ্চপাণ্ডবদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ থেকে বিরত করা। এই বিরত করার মানুষদের তালিকায় ছিলেন কুন্তী, দ্রৌপদী এবং শ্রীকৃষ্ণ। তবে শেষমেশ সূত-পুত্র কেন অস্ত্রধারণ করল, কেন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি হয়—সেই বিষয়টি তুলে ধরার পাশাপাশি বর্তমান সময়ে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলাও এই নাটকের মূল বিষয়।  অর্থাৎ চেনা গল্পের আড়ালে পরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায় খুঁজতে চেয়েছেন এক ভিন্ন সত্য।

এই প্রসঙ্গে বেশ ফুরফুরে মেজাজেই পাওয়া গেল নাট্যকারকে – “প্রথম পার্থ মঞ্চস্থ করা কিন্তু হঠাৎ কোনও পরিকল্পনা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন দেশের মধ্যেই চলছে যুদ্ধ, বর্তমানে ইরান-আমেরিকা-মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চলা যুদ্ধ...অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে এই যুদ্ধের দামামা...সারা প্রথিবীতে একটা যুদ্ধের আবহ। আচ্ছা কোনও কি উপায় থাকে না এই যুদ্ধকে আটকানোর? কোনও উপায়-ই কি থেকে না শেষপর্যন্ত এই যুদ্ধ আটকানোর -এই প্রশ্ন, ভাবনা থেকেই এই নাটকটিকে মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনা। আর মহাভারত-ও তো একটি বিরাট যুদ্ধের পটভূমিতে তৈরি হওয়া মহাকাব্য। আচ্ছা, সেখানেও কি কোনওভাবে সেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধটা আটকানো যেত? সেই বিষয়টিকেই আরও একবার ফিরে দেখা, বোঝার চেষ্টা করছি আমরা। এই যুদ্ধটাকে বোঝার চেষ্টা করা।”

খানিক থেমে পরিচালক স্পষ্ট জানিয়েছেন, জোর করে কোনো সমসাময়িক বিষয় তিনি নাটকে ঢোকাননি। বরং বুদ্ধদেব বসুর লেখনীর মধ্যেই এমন কিছু চিরকালীন সত্য আছে যা আজও প্রাসঙ্গিক। নাটকের দুই ‘বৃদ্ধ’ চরিত্র, যাঁরা সাধারণ নাগরিকের প্রতিনিধি, তাঁরাই পুরো নাটকে খুঁজে বেড়ান—যুদ্ধ থামানোর কি কোনোই উপায় নেই? আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নহীন সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধ আসলে কী নিয়ে আসে, সেই যন্ত্রণাই ফুটে উঠবে মঞ্চে।  দেবেশের চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, " এই সাধারণ মানুষের প্রশ্নের জবাব খুঁজে ফেরার মধ্যে দিয়েই এগোয় নাটক। আসলে কী জানেন তো...এই যে সাধারণ মানুষ যারা ছোট্ট ছোট্ট বিষয়ের মধ্যেই সুখ খুঁজে নেয়, আকাশ ছুঁয়ে ফেলার স্বপ্ন নেই, তাদের কাছে যুদ্ধটা কী আসলে? তাদের কাছে এই যুদ্ধটা কীভাবে পৌঁছয়? এইসব প্রশ্ন তুলবে এই নাটক। 

কথা শেষে ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকের পরিচালক জানালেন, ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে এই নাটকের মহড়া। তাঁর থেকেই জানা গেল, ‘প্রথম পার্থ’-এ কর্ণের ভূমিকায় থাকছেন অর্ণ মুখোপাধ্যায়। শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে দেখা যাবে দাপুটে অভিনেতা রজতাভ দত্তকে। কুন্তীর চরিত্রে সেঁজুতি মুখোপাধ্যায় এবং দ্রৌপদীর ভূমিকায় অভিনয় করবেন সুকন্যা চক্রবর্তী। দুই বৃদ্ধ কথকের চরিত্রে রয়েছেন অভ্র মুখোপাধ্যায় ও শ্যামসিশ পাহাড়ি। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর পরিচালক দেবেশের এই নতুন প্রয়াস ঘিরে ইতিমধ্যেই নাট্যপ্রেমীদের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে।

 

&t=4s