যুদ্ধের দামামা যখন বিশ্বজুড়ে, তখন সেই আদিম ধ্বংসলীলার উত্তর খুঁজতে আবারও মহাকাব্যের শরণাপন্ন নাট্যকার দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। বুদ্ধদেব বসুর কালজয়ী কাব্যনাট্য ‘প্রথম পার্থ’ নিয়ে মঞ্চে ফিরছেন তিনি। তবে এটি কেবল কুরুক্ষেত্রের গল্প নয়, বরং ইরান-আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অশান্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ থামানোর এক চিরকালীন আকুলতা। চলতি মাসেই অ্যাকাডেমিতে ‘মুখোমুখি নাট্য উৎসবে’ প্রথমবার মঞ্চস্থ হয়েছে এই নাটক।
বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্ব দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। অবশ্য পরিচালকের আসন ছেড়ে মাঝেমধ্যেই তিনি উঠে আসেন মঞ্চে। তবে এবারে ফের একবার নিজের পরিচালনায় নাটক প্রথম পার্থ নিয়ে ফিরেছেন দেবেশ। বুদ্ধদেব বসু রচিত এই বিখ্যাত কাব্যনাট্যতে প্রধান ভূমিকায় দেখা গিয়েছে অর্ণ মুখোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত, অভ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামসিশ পাহাড়ি, সুকন্যা চক্রবর্তী ও সেঁজুতি মুখোপাধ্যায়কে। ‘প্রথম পার্থ’-এ কর্ণের ভূমিকায় রয়েছেন অর্ণ মুখোপাধ্যায়। শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে দেখা গিয়েছে দাপুটে অভিনেতা রজতাভ দত্তকে। কুন্তীর চরিত্রে সেঁজুতি মুখোপাধ্যায় এবং দ্রৌপদীর ভূমিকায় অভিনয় করছেন তূর্ণা। দুই বৃদ্ধ কথকের চরিত্রে রয়েছেন অভ্র মুখোপাধ্যায় ও শ্যামসিশ পাহাড়ি। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর পরিচালক দেবেশের এই নতুন প্রয়াস ঘিরে ইতিমধ্যেই নাট্যপ্রেমীদের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে।
বিশ্বের দীর্ঘতম মহাকাব্য মহাভারত-এর অষ্টম পর্ব ‘কর্ণ পর্ব’ থেকে নেওয়া খণ্ডাংশ—সুনির্দিষ্টভাবে কর্ণের মাতৃ ও জন্ম পরিচয়ের গুপ্ত তথ্য প্রকাশ এবং তাকে তারই সহোদর পঞ্চপাণ্ডবদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ থেকে বিরত করা। এই বিরত করার মানুষদের তালিকায় ছিলেন কুন্তী, দ্রৌপদী এবং শ্রীকৃষ্ণ। তবে শেষমেশ সূত-পুত্র কেন অস্ত্রধারণ করল, কেন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি হয়—সেই বিষয়টি তুলে ধরার পাশাপাশি বর্তমান সময়ে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলাও এই নাটকের মূল বিষয়। অর্থাৎ চেনা গল্পের আড়ালে পরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায় খুঁজতে চেয়েছেন এক ভিন্ন সত্য। জনতামহলে এই নাটককটি ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়োলেও দর্শকের মনে একটি প্রশ্ন উঁকি মেরেছিল - মঞ্চে নাটকটি প্রশংসিত হলেও দর্শকের মনে একটি প্রশ্ন উঁকি মেরেছিল। ছোটপর্দা বা সিনেমায় এতদিন শ্রীকৃষ্ণকে যেভাবে ‘যোদ্ধাসুলভ’ বা সুপুরুষ অবয়বে উপস্থাপন করা হয়েছে, ‘প্রথম পার্থ’-তে কৃষ্ণকে সেভাবে দেখানো হয়নি। সেই চেনা ক্যালেন্ডারের চেহারার সঙ্গে রজতাভ দত্ত অভিনীত কৃষ্ণের কোনও মিল নেই। কেন এই ব্যতিক্রমী ভাবনা? আজকাল ডট ইন-কে জবাব দিলেন প্রথম পার্থ-তে শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে অভিনয় করেছেন যিনি, সেই রজতাভ দত্ত স্বয়ং।
“দেখুন, প্রথম পার্থ-এর সবটুকুই কিন্তু সরাসরি মহাভারত-এর অংশ নয়। কুন্তী যখন কর্ণের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, কৃষ্ণ পরে কর্ণকে যুদ্ধ থেকে বিরত করে এসেছেন - এসব অবশ্যই মহাভারতের অংশ। বাকিটুকু বলতে পারেন লেখক বুদ্ধদেব বসুর সৃষ্টির চোখ দিয়ে দেখা একটা টেক গোটা মহাভারতের। কাজেই সেখানে কিন্তু কৃষ্ণ ডিপ্লোম্যাট বা কূটনীতিবিদ। তাই সেখানে চেহারাটা খুব একটা ম্যাটার করছে না।” আর একটা কথা, যে সময়টায় এই ঘটনাবলি ঘটছে, তখন কিন্তু পঞ্চ পাণ্ডব সহ কৃষ্ণ যথেষ্ট বর্ষীয়ান। কারণ ততদিনে বনবাস কাটিয়ে ফেলেছেন পাণ্ডবরা, দ্রৌপদী তখন পাঁচ সন্তানের মা। আর কর্ণ তো কুন্তীর বিয়ের আগের সন্তান। ফলে যুধিষ্ঠিরের দাদা কর্ণের বয়স তো এই হিসেবে প্রায় প্রৌঢ়। কৃষ্ণ তো বটেই!তাই টেলিভিশনে কিংবা ক্যালেন্ডারে কৃষ্ণের যে অবয়ব লোক দেখছেন, সেই যোদ্ধাসুলভ চেহারা তো এই বয়সে কৃষ্ণের থাকার কথা নয়। প্রকৃতির নিয়মেই। কৃষ্ণ ততদিনে রাজপরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য। কাজেই এতদিন যে আতস কাচের মধ্য দিয়ে এই চরিত্রগুলোকে সাধারণত দেখা হয়েছে, এই নাটক সেই অভ্যস্ত ধারণাকে একটা বড় ঝাঁকানি দিয়েছে।”















