কলকাতার এককালের ঐতিহ্যবাহী ‘অফিস থিয়েটার’ হয়তো বর্তমানে কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে, কিন্তু শহরের অভিজাত ক্লাবগুলো কিন্তু আজও নাটকের সেই ধারা সগৌরবে বয়ে নিয়ে চলেছে। শুধুই মনোরঞ্জন দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি এবং সদস্যদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদে এই ক্লাবগুলো মঞ্চস্থ করছে চমৎকার সব নাটক। এমনই এক ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হল ক্যালকাটা ক্লাব। 

 

 

ভারতের অন্যতম সুপ্রসিদ্ধ এই  ক্লাব ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্বভাবতই তখন এ দেশে ব্রিটিশ আমল। যেখানে একসময় ব্রিটিশদের ক্লাবগুলোতে ভারতীয়দের প্রবেশাধিকার ছিল না, সেই প্রেক্ষাপটেই এই ক্লাবের জন্ম। আজ ২০২৬ সালেও ক্যালকাটা ক্লাব তার আভিজাত্য বজায় রেখে শহরের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।শহরের ব্যস্ত কর্পোরেট এবং পেশাদার জীবনের ক্লান্তি দূর করতে এখানকার সদস্যরা প্রতিবছরই বিভিন্ন নাটকের আয়োজন করেন। বিশেষ করে বাংলা নববর্ষ (পয়লা বৈশাখ) এবং ক্লাবের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে প্রতিবছরই সদস্যদের অংশগ্রহণে একটি বিশেষ নাটক মঞ্চস্থ হয়। এবং তা মঞ্চস্থ হয় ঠিক বাংলা নববর্ষের আগের দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তির লগ্নে। এবং এবারও সেই নিয়মের কোনও হেরফের হয়নি। জানিয়ে রাখা ভাল, এই নাটকগুলোর বিশেষত্ব হলো, মঞ্চে অভিনয় থেকে শুরু করে নেপথ্যের কাজ—সবটাই সামলান ক্লাবের সদস্যরা। ক্লাব সদস্যদের মতে, এটি কেবল তাঁদের শিল্পীসত্তাকে প্রকাশ করে না, বরং সদস্যদের মধ্যে একটি শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন তৈরি করে।

 

 

এ বছর (২০২৬) ক্যালকাটা ক্লাবের সদস্যদের অভিনীত নাটকটির নাম ‘ত্রিশূল’। পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন চিকিৎসক সন্দীপ রায়। তরুণ রায়ের রচিত এই নাটক এক সময় দারুণ মঞ্চসফল ছিল। প্রায় ১২টি চরিত্র নিয়ে তৈরি এই নাটক আদতে জমাটি মার্ডার মিস্ট্রি। তা কেন এই নাটকটিকে এবারের ক্যালকাটা ক্লাবের বার্ষিক বাংলা নাটক হিসেবে বাছাই করা হল? পরিচালকের সপাট জবাব, “তরুণবাবুর লেখা দু'টি থ্রিলার সাতের দশকে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। একটি এক পেয়ালা কফি, অন্যটি ত্রিশূল। তুলনামূলকভাবে প্রথম নাটকটি অনেক বেশি মঞ্চস্থ হয়েছে। তাই ত্রিশূল-কে আমরা বেছে নিয়েছি। আর এর পাশাপাশি বলব, বাংলা থ্রিলার নাটকের অন্যতম সেরা স্তম্ভ ত্রিশূল। এর ব্যাপ্তি চিরকালীন। আমার বিশ্বাস, আজকের সময়ের দাঁড়িয়েও এখনকার দর্শকের কাছে এই নাটক দারুণ উপভোগ্য হবে।” পাশাপাশি তিনি আরও বললেন, “এটা টি-টোয়েন্টির যুগ। দর্শককে ধরে রাখতে গেলে চটপটা কিছু দরকার। কিন্তু আমাদের দলের শিল্পীরা এতটাই ভাল, এতটাই প্যাশনেট এবং এর পাশাপাশি এরকম টানটান গল্প-সংলাপ...তাই কোনও সমস্যা নেই।” 

 

নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেতা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। 'ত্রিশূল'-এর গল্প যে পরিবারটি ঘিরে আবর্তিত হয়েছে,সেই পরিবারেরই প্রধান বিশ্বজিৎ ভাদুড়ী র ভূমিকায় এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। টি-এস্টেট রয়েছে তাঁর, জমিদার বংশ।   তাঁর কথায়, “হৈ হুল্লোড়, খাওয়াদাওয়া, মদ্যপান করা ছাড়াও ক্যালকাটা ক্লাবের সদস্যরা নিষ্ঠাভরে বাংলার সংস্কৃতিটাকে পালন করে। সেটা খুব গর্বের। এবারের নাটকটির পরিচালনা খুব দক্ষ হাতে সামলেছেন সন্দীপ। পেশায় নামী শল্যচিকিৎসক হলেও নাটক তাঁর অন্তপ্রাণ। এই নাটকের দলের প্রত্যেক সদস্যই বিভিন্ন পেশার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু স্রেফ নাটকের প্রতি ভালবাসার টানে আমরা একত্রিত হই সবকিছু সামলে। এটা কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে চিকিৎসক রামাদিত্য রায়ের কথা উল্লেখ করব। আর একটা কথা, সপ্তাহের মাঝের দিনে বিরল সভাঘরের মতো বড় প্রেক্ষাগৃহ হাউজফুল-এটাও এড়িয়ে যাওয়ার মতো বিষয় নয় কিন্তু...যতদিন বেঁচে থাকব, কর্মক্ষম থাকব এবং পরিচালক চাইবেন আমি কিন্তু ক্যালকাটা ক্লাবের নাটকে পারফর্ম করে যেতে চাই!”   

চিকিৎসক রামাদিত্য রায় দীর্ঘ বছর ধরেই বড়পর্দায় ও ছোটপর্দায় ঘোরাফেরা করছেন দাপটের সঙ্গে। এবং তাঁর সঙ্গে মঞ্চেও। উৎপল দত্তের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল তাঁর অভিনয়-জীবন। পরে তাঁর হাতের মুঠো আরও শক্ত ওড়েছিলেন জোছন দস্তিদার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। নিয়ম করে প্রতি বছরই তিনি ক্যালকাটা ক্লাবের বার্ষিক বাংলা নাটকে পারফর্ম করে এসেছেন। পাশাপাশি নাট্য পরিচালকের আসনেও বেশ দেখা যায় তাঁকে। আজকাল ডট ইন-কে তিনি সখেদে বলে উঠলেন, “না, না আমি পরিচালক হতে চাই না। জোর করে লোকজন আমাকে পরিচালকের আসনে বসিয়ে দেয়। আমি অভিনয়টাই করতে ভালবাসি। তবে যেভাবে করতে চাই, সবসময় তো সেই সুযোগ পাওয়ায় যায় না, তবে সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ি...এই নাটকে আমার চরিত্রটিকে অল্প সময়ের জন্যই মঞ্চে দেখতে পাবেন দর্শক কিন্তু তাঁর অভিঘাত সাংঘাতিক। চরিত্রটির মধ্যে একটা টান আছে। নাটকের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এই চরিত্রটি। আর বেশ অন্যরকম। যে এস্টেটের পরিবারকে ঘিরে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গিয়েছে ত্রিশূল-এর গল্প। আমি সেই পরিবারের সবাই মারা গিয়েছে বেঁচে রয়েছে কেবল তিনজন -এই তিনজেনের একজন হলাম আমি। আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করা হয়েছিল একটা সময়ে। আমার অভিনীত রিত্রটি নাটকের নায়িকার কাকা।”

সামান্য থামলেন চিকিৎসক-অভিনেতা। এরপর ফের বলা শুরু করলেন, “ ‘ত্রিশূল’ নাটকটি কিন্তু আমি মঞ্চে দেখেছি। পরবর্তী সময়ে দূরদর্শনেও এই নাটকটি পরিবেশন করা হয়েছিল। সেই সাদা-কালোর যুগে, তা-ও আমি দেখেছি। এবার সেই নাটকেই অভিনয় করছি। জীবনের একটা বৃত্ত পূর্ণ হল বলতে পারেন। আর ক্যালকাটা ক্লাবে আমার পিসি কাজল সেন এক সময় অভিনয় করতেন, এখন আমি করছি। সেই দিক থেকে দেখলেও ক্যালকাটা ক্লাবের এই বার্ষিক নাটকে অংশগ্ৰহণ করা আমার কাছে সম্মানের ও ভীষণ আনন্দের।”  কথাশেষে তাঁর সংযোজন, “দর্শক যখনই পুরনো দিনের স্বাদ পায় কোথাও, তাঁরা বারবার সেখানে ফিরে আসেন। আমার বিশ্বাস এই নাটকটিও সেই ধারার।”


প্রায় ১২টি চরিত্র নিয়ে গড়ে ওঠা এই নাটকটি কেবল একটি প্রযোজনা নয়, বরং একটি পেশাদার দলের মতো নিপুণতার সঙ্গে কাজ করেছেন ক্লাবের সদস্যরা। অভিনয় থেকে শুরু করে আলো, শব্দ—নেপথ্যের সব দায়িত্ব সামলেছেন সদস্যরাই। প্রবীণ শিল্পী থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্ম—সবার এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই ক্যালকাটা ক্লাবকে আজও শহরের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে সেরাদের আসনে বসিয়ে রেখেছে।