পুজো চলে এল প্রায়। এবারে উৎসবের মরশুমে চার- চারটি ছবি মুক্তি পাচ্ছে। তালিকায় রয়েছে ‘রক্তবীজ ২’, ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’, ‘দেবী চৌধুরাণী’ এবং ‘রঘু ডাকাত’। গুঞ্জন, সম্প্রতি রাজ্য সরকারের গড়ে দেওয়া নতুন কমিটির বৈঠকের পরেও নাকি চারটি ছবির প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা এবং প্রদর্শনের সময় নিয়ে নাকি দ্বন্দ্ব বেধেছে। এবং তা বেশ ভালরকমই। 

শিবপ্রসাদের স্ত্রী তথা ‘রক্তবীজ ২’ ছবির কাহিনি-চিত্রনাট্যকার জিনিয়া সরাসরি আজকাল ডট ইন-কে বললেন, “দেখুন, এখনও তো প্রি-বুকিং শুরু হয়নি। হাতে-কলমে তাই কিছু না দেখে বলতে পারছি না। কিন্তু এটুকু বলতে পারি, যখনই একটি নির্দিষ্ট প্রভাবশালী প্রযোজনা সংস্থার ছবি আমাদের ছবির সঙ্গে মুক্তি পায়, প্রতিবারই এই সমস্যা হয়। এই শো-টাইম নিয়ে সমস্যা লেগেই থাকে, নতুন কিছু নয়। এবং খানিক প্রভাব তো ব্যবসায় পড়েই। একটা কথা বলি, বহুরূপী যে পরিমাণ ব্যবসা করেছে গত পুজোয়, সে তো রেকর্ড পরিমাণ,তার পর এই রকম আশঙ্কা হবে কেন? এটা কি জোর যার মুলুক তার?”

পরিবেশক শতদীপ সাহা অল্প কথায় সোজাসাপটাভাবে বললেন, “এটা তো হওয়ারই ছিল।  সব প্রযোজকেরা একসঙ্গে নিজেদের ছবি আনলে সমস্যা তো হবেই। নিজেদের একটু ব্যালেন্স না করে ভাগ করে নেন শো-টাইমিং চললে তো মুশকিল। এখানে প্রযোজকেরা কেউ কারও কথা তেমনভাবে শোনেন না। সবাই নিজেদের মতো স্ট্র্যাটেজি ঠিক করেন। একইদিনে এতগুলো ছবি মুক্তি পেলে, সমস্যা তো হবেই। নতুন-নতুন বছর আসে কিন্তু ছবিটা এক থেকে যায়। এই পুজোর পর ডিসেম্বরের দিকে তাকান, তখনও ক্রিসমাসের সময় একগুচ্ছ ছবি মুক্তি পাচ্ছে। কী বলব! তবে এখনও পুজোর ছবির প্রেক্ষাগৃহ বা প্রদর্শন সময় বা সংখ্যা নিয়ে আমরা কিছু ঠিক করিনি। প্রাথমিক কথাবার্তা হয়েছে নিশ্চয়ই হয়েছে প্রেক্ষাগৃহের অধিকর্তাদের সঙ্গে, তবে চূড়ান্ত কিছু নয়। আগে এই শুক্রবারের ‘জলি এলএলবি ৩’ এর ঝক্কিটা মেটাই, তারপর দেখা যাবে ওদিকটা।”

 

‘প্রিয়া’ প্রেক্ষাগৃহের কর্ণধার সোজাসাপটা ভাষায় বললেন, “একটা কথা খুব পরিষ্কার করে বলি। একসঙ্গে একগুচ্ছ ছবি মুক্তি পেলে মাল্টিপ্লেক্স প্রেক্ষাগৃহগুলোর কোনও সমস্যা হয় না। কারণ, সেখানে অনেকগুলো ছবি একসঙ্গে চলে। যত মুশকিল হয় আমাদের সিঙ্গল-স্ক্রিন হল মালিকদের। আমাদের তো একটাই বড়পর্দা। চারটে শো-টাইম। আমি তো তিনটে প্রাইম টাইমে চারটে বাংলা ছবি চালাতে পারব না! পারব কি? তাহলে? আরও কিছু কথা বলা দরকার। আমাকে যে আগে এপ্রোচ করবে, আমি তো তাঁর কথাই গুরুত্ব দিয়ে ভাবব, নাকি? ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ ছবির প্রযোজক আমার সঙ্গে মাস দেড়েক আগেই যোগাযোগ করেছিলেন, একের পর এক বৈঠক করেছিলেন। তাই স্বভাবতই ওঁর ছবি আমি একটি প্রাইম টাইম শো-এ রেখেছি। এবার কেউ যদি মনে করেন, আমার ছবি বড় বাজেট তাই আমি সবার শেষে গিয়ে প্রস্তাব দেব, আর সব হয়ে যাবে...সেটা তো হবে না। এবং যেটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা তো ব্যবসা। আমরা তো ব্যবসা করি। আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে যদি বুঝি, ছাড়তে ছবির মধ্যে যে কোনও দু’টো ছবি ভাল ব্যবসা করবে, আমি তো তাদেরকেই প্রাইম-টাইমিং দেব! শেষে অবশ্যই জুড়ব একটা কথা। এই পুজোয় যে চারটে বাংলা ছবি মুক্তি পাচ্ছে, আমি তাদের প্রত্যেকটিই আমার প্রেক্ষাগৃহে দেখতে চাই। কিন্তু কোনও ছবির প্রযোজক যদি বলেন, তাঁর আমার ঠিক করে দেওয়া শো-টাইম পছন্দ নয়, তাই আমাকে তাঁদের ছবি দেওয়া হবে না, তাহলে আমি কী করতে পারি?”  

 

বেহালা অঞ্চলের ‘অশোকা’ প্রেক্ষাগৃহের কর্ণধার প্রবীর রায় বললেন, “দেখুন, এই চারটি বাংলা ছবির প্রতিটি তাদের নিজগুণে আলাদা। আমার সঙ্গে চার ছবির প্রযোজকের সম্পর্কই বেশ ভাল। এবারের পুজোতে পাঁচটি শো চলবে অশোকা-তে। সকাল ১০:৩০ থেকে শুরু হবে প্রথম শো আর শেষ শো শুরু হবে রাত ১০টার পর। দেখুন, সবারই লক্ষ্য থাকে, ম্যাটিনি এবং ইভিনিং শো-টাইমিংয়ের উপর। কিন্তু পুজোয় বাকি সময়ের শো-গুলো যে পরিমাণ দর্শক দেখতে আসেন, তা চমকে দেওয়ার মতো। এটা পুজোর অভ বলেই সম্ভব। যাই হোক, যেটা বলছিলাম...আমরা তো ব্যবসা করতে এসেছি। এখনও কিছু পাকা কথা হয়নি। অ্যাডভান্স বুকিং শুরু হতে এখনও দিন পাঁচেক। তবে হ্যাঁ, প্রাথমিক কথা তো হয়েছে। আমার প্রেক্ষেগৃহের তিনটে প্রাইম-টাইমিং শোয়ের মধ্যে দর্শকের যা চাহিদা সেই নিরিখে আমি তো ‘রক্তবীজ ২’ এবং ‘রঘু ডাকাত’-কে রাখার চেষ্টা করব। অন্যদিকে, অনীক দত্ত একজন দুর্দান্ত পরিচালক। ওঁর ছবির একটা বড় দর্শক আছে, সেটাও মাথায় রয়েছে আমার। এবং ‘দেবী চৌধুরাণী’র মতো ছবিতে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় একটা ফ্যাক্টর। সেটাও বা ভুলি কী করে। সুতরাং, কথাবার্তা-চিন্তাভাবনা সবই চলছে। এটা তো সত্যিই বড় সমস্যা। চূড়ান্ত কিছু হয়নি। দেখা যাক...”

 

 

তবে ‘নবীনা’ প্রেক্ষাগৃহের কর্ণধার নবীন চৌখানি গলার সুর কিন্তু বেশ আলাদা এ ক্ষেত্রে। ব্যাপারটি নিয়ে খানিক ক্ষুব্ধ হলেও যথেষ্ট আশাবাদী তিনি। বলে উঠলেন, “এত ঝামেলা ভাল লাগছে না। ইন্ডাস্ট্রির প্রযোজকদের মধ্যে কোনও ঐক্য নেই! কেউ কারও কথা শুনবে না। কিছুদিন আগে এত বড় বৈঠক হল, কী লাভ হল? প্রাইম টাইমিংয়ের দু'টো ছবিকে জায়গা দিতেই হবে। তা দিলে, বাকিরা সমস্যা করবে। আমরা সিঙ্গল স্ক্রিন-এর কর্ণধাররা কোথায় যাব তখন? সেরকম হলে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ করে রাখব, তাতে নিজের আর্থিক ক্ষতি হবে তো হোক! এত ঝামেলা কে পোহাবে?” 

 

খানিক থেমে নবীন ফের বলে ওঠেন, “তবে হ্যাঁ, এখনই আশা হারাচ্ছি না। এই সমস্যা বেশ বড় এবং উত্তরোত্তর তা বাড়ছে। আমি নিশ্চিত রাজ্য সরকারের তরফে এই নিয়ে কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সেরকম নেওয়া হয়েছিল বলেই না ধূমকেতু এত প্রেক্ষাগৃহে এরকম শো-টাইমিংয়ে মুক্তি পেয়েছিল। আপাতত পুজোর কোনও ছবির শো-টাইমিং নিয়ে কিচ্ছু চিন্তাভাবনা করছি না। এখনও তো দিন পাঁচেক বাকি আছে। দেখি অবস্থা কোনদিকে গড়ায়, সেই বুঝে ব্যবস্থা নেব। আমার বিশ্বাস, অবশ্যই রাজ্য সরকারের তরফে আলোচনা সভা ডাকা হবে এ বিষয়ে। এবং আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে যেখানে সব পক্ষ-ই নিশ্চিন্ত থাকবে।”