কলকাতা শহর চিরকালই সংস্কৃতি এবং মননচর্চার পীঠস্থান। সেই ধারাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল আইসিসিআর, কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া বেঙ্গল আর্টস অ্যান্ড লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল ২০২৬। ‘এক্সেলার বুকস’-এর আয়োজনে দিনব্যাপী এই বর্ণাঢ্য উৎসবে দেশ-বিদেশের কবি, লেখক, অনুবাদক, কূটনীতিবিদ, গবেষক এবং চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের এক অপূর্ব সমাগম ঘটেছিল।
উৎসবে আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের যে মূল ভাবনা, তা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বিদেশি প্রতিনিধিদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে। মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় স্মৃতিমঞ্চে উৎসবের প্রদীপ জ্বালিয়ে উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট ভাষাবিদ ও অধ্যাপক পবিত্র সরকার। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মাত্রার সংযোজন ঘটিয়ে উপস্থিত ছিলেন কলকাতায় নিযুক্ত চিনের কনসাল জেনারেল শু ওয়েই, জাপানের ডেপুটি কনসাল জেনারেল আশিদা কাতসুনোরি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে শিক্ষাবিদ ও কবি অধ্যাপক সংযুক্তা দাশগুপ্ত।
উদ্বোধনী পর্বেরই অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাতা অধ্যাপক অশোক বিশ্বনাথন এবং কবি-শিক্ষাবিদ স্বরূপা চ্যাটার্জীর সম্পাদনায় দুশোর বেশি কবিতার সংকলন ‘এপিটিক কোল্ড ওয়ার’-এর আনুষ্ঠানিক প্রকাশ।

সংস্কৃতি, শিক্ষা, প্রকাশনা এবং পারফর্মিং আর্টসে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এবছর বেশ কয়েকজন কৃতি ব্যক্তিত্বের হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মানীয় ‘টেগোর সম্মান ২০২৬’। সম্মানিতদের তালিকায় ছিলেন -
সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় (বিশিষ্ট শিল্পী)
অমর মিত্র (জনপ্রিয় সাহিত্যিক)
অঞ্জন দত্ত (স্বনামধন্য সংগীতশিল্পী ও পরিচালক)
লতা বাজোরিয়া (শিল্পোদ্যোগী)
অধ্যাপক হরিশ মেহতা (শিক্ষাবিদ)
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় (বিশিষ্ট লেখক ও পাবলিশার্স গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক)
এবারের উৎসবের একটি অন্যতম মূল স্তম্ভ ছিল ‘অনুবাদ সাহিত্য’। ‘সাহিত্যে আলো ফেলে অনুবাদ’ শীর্ষক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে অংশ নেন অংশুমান কর, অপু দে, রিনি গঙ্গোপাধ্যায় এবং সৈয়দ কাওসার জামাল। চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের সুনিপুণ সঞ্চালনায় উঠে আসে ভাষান্তরের নানা নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জের কথা। অন্যদিকে, ‘ল্যাঙ্গুয়েজ পলিসি অ্যান্ড ট্রান্সলেশন স্টাডিজ’ অধিবেশনে হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নন্দিনী সাহু এবং প্রখ্যাত সাহিত্যিক অলকা সরাওগি বহুভাষিকতা ও ভাষিক বৈচিত্র্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন।
কবিতা পাঠের আসরে প্রফুল্ল রায় ও রাহুল পুরকায়স্থ স্মৃতিমঞ্চে রবীন্দ্র-প্রেরণায় ‘মুক্তধারা’ কবিতা-পাঠের আয়োজন দর্শকদের মুগ্ধ করে। দেবাংশ বোসের ‘দ্য ওয়েট অফ হোয়াইট’ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশও ছিল এই পর্বের অন্যতম আকর্ষণ। পাশাপাশি, রবীন্দ্রনাথকে নতুন আঙ্গিকে চেনার লক্ষ্যে ‘টেগোর ইন ট্রান্সলেশন: দ্য পোস্ট অফিস’ গ্রন্থের প্রকাশ ও শিবাজী দাশগুপ্তের সঞ্চালনায় এক মনোজ্ঞ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর সাথেই প্রদর্শিত হয় রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাড়া জাগানো তথ্যচিত্র ‘ক্র্যাকিং দ্য গ্লাস সিলিং’।

সাহিত্যের পাশাপাশি শিল্পের ক্যানভাসও সেজে উঠেছিল ডিরোজিও আর্ট গ্যালারিতে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চেতনাকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪০ জন শিল্পীর তুলিতে সেজে ওঠা ‘সুজলাং সুফলাং’ চিত্রপ্রদর্শনীটি দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।
এছাড়াও, উৎসব প্রাঙ্গণে সোঁদা, এক্সেলার বুকস্টোর, উদযাপন এবং রুটস অ্যান্ড শুটস-এর মতো জনপ্রিয় বিপণীগুলোকে নিয়ে জমে উঠেছিল ‘ফেস্টিভ্যাল বাজার’। বই, হস্তশিল্প, বাউল গানের সুর এবং সৃজনশীল স্টলগুলোতে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
এই আয়োজন নিয়ে এক্সেলার বুকসের প্রতিষ্ঠাতা ড. সুদীপ্ত কুমার ঘোষ বলেন, “বিএএলএফ মূলত এক্সেলার বুকসের পঞ্চমবার্ষিক অনুষ্ঠানের একটি প্রবর্ধিত ও বৃহত্তর রূপ। আমরা চেয়েছিলাম সাহিত্য, শিল্প ও শিক্ষাচর্চাকে এক ছাদের তলায় এনে সংলাপের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করতে।”
সহ-প্রতিষ্ঠাতা অঞ্জিতা গাঙ্গুলী জানান, এ ধরনের মননশীল উৎসব একটি সাংস্কৃতিকভাবে সংযুক্ত সমাজ গঠনে অত্যন্ত জরুরি। উল্লেখ্য, চলতি ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসেই এই প্রকাশনা সংস্থা সফলভাবে ১৫ বছর পূর্ণ করতে চলেছে।
এবারের আসরে হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় ‘নলেজ পার্টনার’ এবং রাইজিং এশিয়া ফাউন্ডেশন ‘একাডেমিক পার্টনার’ হিসেবে যুক্ত থেকে অনুষ্ঠানটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বহুভাষিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক নতুন অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে শেষ হল বিএএলএফ ২০২৬।














