টেলিভশন, ওটিটি এমনকী বড়পর্দায় পরিচিত মুখ অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের থেকেও পেয়েছেন দারুণ ভালবাসা। কিন্তু একটা সময় এই অভিনেতাই নেশাকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। একাধিকবার অকপটে জানিয়েছেন সেই কথা। তবে এদিন তাঁর নেশামুক্তির ১৮ বছর পূর্ণ হতে সমাজমাধ্যমে কলম ধরলেন অভিনেতা।
অনিন্দ্য লেখেন, 'শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে ।আজকে ২৩শে জানুয়ারি। আমার নেশামুক্তির জন্মদিন। আর এই জন্মদিনটাই আমার সবচেয়ে কাছের। কারণ আমার নেশামুক্তির ১৮ বছর।
২৯শে ডিসেম্বর আমার বায়োলজিক্যাল জন্মদিন। কিন্তু এই দিনটা আমার কাছে অনেক বেশি স্পেশাল। ২০০৮ সালের এই দিনটা আজও জলের মতো স্পষ্ট। ব্যাঙ্কশাল কোর্টে হাজিরা দিয়ে আমাকে রিহ্যাবে ফিরতে হয়েছিল। সকাল ন’টার বনগাঁ লোকাল। গন্তব্য হাবড়া। পকেটে শেষবারের মতো নেশা করার মতন একটা সিরিঞ্জ একটু ব্রাউন সুগার। হাবড়া স্টেশন থেকে একটু এগোলেই সেই রিহ্যাব। যেখান থেকে আমার ভালো থাকার লড়াই শুরু। তার আগে ২৮ বা ২৯টা ডিটক্স আর রিহ্যাব হয়ে গেছে। ছাড়া পেলেই রিলাপস।আমরা যাকে বলি ক্রনিক রিল্যাপসি।'
তিনি আরও লেখেন, 'ছয় সাত বছর ধরে একটাই বৃত্ত। বাইরে নেশা। ভিতরে তালা চাবির মধ্যে তথাকথিত ভালো থাকা। নিজে বিশ্বাস করতাম না যে আমি ভালো হতে পারবো। আমার পরিবারও বিশ্বাস করতো না। উত্তর কলকাতার মধ্যবিত্ত পরিবার। সামর্থ্য সীমিত। মায়ের গয়না। বাবার সঞ্চয়। সব শেষের পথে। বাইরের লটরবহর তখন আমার কাছে সোনার মতো দামী। লোহার জিনিস। অ্যালুমিনিয়াম। কাঁসা। তিন মিনিটে গাড়ির লক খুলতাম। নোকিয়ার ফোন মানেই দুই তিন হাজার টাকা ক্যাশ। এক সময় বুঝতে পারছিলাম, এভাবে চললে ২৮ পর্যন্ত টানতে পারবো না। চোখের সামনে চারজন ইউজিং পার্টনার মারা গেল। ভয় পেয়েছিলাম। সেই অবস্থায় রিহ্যাব ছাড়া আর কোনো রাস্তা ছিল না। থাকলে হয়তো আরও কদিন টানতাম। পারিনি।'
অনিন্দ্য লেখেন, 'এই উপলব্ধিটাই আমাকে সাহস দিয়েছিল। এভাবেই শুরু। শুরুটা কঠিন ছিল।
না কেউ বিশ্বাস করতো। না আমি নিজে। নেশাই ছিল আমার ধ্যানজ্ঞান ভালোবাসা। ওটাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম। নেশা আমাকে মারতে চেয়েছিল। সেদিন আমি হেরেছিলাম।
আর হেরেছিলাম বলেই আজ জিতছি। আজ রাস্তায় লোকে সেলফি চায়। অটোগ্রাফ চায়।
ভালোবাসা দেয়। নিজেকে দেখে স্বপ্নের মতো লাগে। এটা সত্যি তো। হয়তো আরও কিছু করতে পারতাম। হয়তো জীবনটা আরও গোছাতে পারতাম। পারিনি। কোনো আফসোস নেই। সমাজ যে সম্মান আর ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়েছে, সেটাই যথেষ্ট। আমার শুরু অনেক নিচ থেকে।
আমার লড়াই আলাদা। কঠিন। আমার লড়াই সেই বাঁদরটার সঙ্গে। যে আজও আমার ভেতরে আছে। যাকে প্রতিদিন বশে রাখতে হয়। কলকাতার বুকে নিজের একটা মাথা গোঁজার জায়গা কিনতেও আমার ১৮টা বছর লেগে গেল। মা যাওয়ার আগে আমাকে নেশামুক্ত দেখে গেছে। বাবা যাওয়ার আগে আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে দেখেছে। গর্ব করে বলতো, আমি অনিন্দ্যর বাবা। বোনেরও আমি গর্ব। এর বেশি আর কী চাই। দিনে দিনে এই লড়াই চলুক। অভিনেতা বা সেলিব্রিটি অনিন্দ্য চাটার্জী আমি বাইরে। ঘরের আয়নার সামনে আমি এখনও সেই বাঁদরটাই। ওকে সামলাতে পারলেই বাকিটা সামলে নেবো। আজকে দেখতে দেখতে আমার ভালো থাকা প্রাপ্তবয়স্ক হলো। আমার উপলব্ধ ঈশ্বর আমাকে এভাবেই আগলে রাখুন। ভালো থাকুক পৃথিবী।ভালো থাকুক আমার মানুষগুলো। বন্ধুরা। আর যারা এখনও নেশা থেকে বেরোনোর লড়াই লড়ছে। এটাই প্রার্থনা।' (পোস্টের সমস্ত বানান অপরিবর্তিত রাখা হল।)
ভাল থাকার সাহস কে জুগিয়েছিল অভিনেতাকে? এক সাক্ষাৎকারে আজকাল ডট ইন-কে অনিন্দ্য বলেছিলেন, "আমি আর পারছিলাম না নেশা করতে। খুব বিধ্বস্ত লাগত। সেই সময় মনের জোর তো অবশ্যই অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিল ভাল থাকার পথে। তবে যারা নেশা ছেড়ে ভাল থাকার রসদ খুঁজে পেয়েছেন তাঁরাই আমায় মনোবল জুগিয়েছেন।"
