যশ রাজ ফিল্মসের বহু প্রতীক্ষিত নারীকেন্দ্রিক স্পাই ইউনিভার্সের নতুন ছবি ‘আলফা’ অবশেষে বড়পর্দায় হাজির। একদম প্রথমেই খোলাখুলি স্বীকার করে নেওয়া ভাল, এই ছবির জন্য এত দীর্ঘ লুকোচুরির অপেক্ষা কোনওভাবেই উসুল হল না।
তবে সিনেমার ব্যর্থতার দায় কিন্তু আলিয়া ভাটের ওপর চাপানো যাবে না। নিজের ছিপছিপে শরীরী গঠনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে, দেশের এক নম্বর সৈনিক ফতেহ সিং (ববি দেওল)-এর কড়া স্কুলে তৈরি এক দুর্ধর্ষ ফাইটিং মেশিন হয়ে ওঠার জন্য আলিয়া নিজের সেরাটা দিয়েছেন। আলফার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে শর্বরীও বেশ নজর কেড়েছেন; বিশেষ করে তাঁর সোলো অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে তিনি দেখিয়েছেন যে বলিউডের নতুন প্রজন্মে তাঁর মেদহীন অ্যাকশনের দম কতটা।
ওদিকে ববি দেওলের ফৌজি চরিত্র এবং অনিল কাপুরের ‘র’ (RAW) প্রধান— দুজনেই নিজেদের চরিত্র অনুযায়ী জান লড়িয়ে দিয়েছেন। ববি দেওল মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর যাবতীয় দুর্বলতার একমাত্র জবাব হল ‘আলফা’। অন্যদিকে, অনিল কাপুর মরিয়া আলফাকে সেইসব শত্রুদের হাত থেকে বাঁচাতে, যাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে স্বয়ং আলফাই নাকি ওয়াকিবহাল নয়! আলফা সিরাম-এর আবিষ্কর্তা তথা বৈজ্ঞানিকের চরিত্রে বরাবরের মতোই দারুণ দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য।
গলদটা তবে কোথায়? একটি তুখোড়, ঝকঝকে স্পাই থ্রিলার হয়ে ওঠার সব রকম মশলা থাকা সত্ত্বেও ‘আলফা’ কেন শেষমেশ মুখ থুবড়ে পড়ল? উত্তরটা লুকিয়ে আছে যশ রাজের সেই পুরনো এবং চেনা দুর্বলতায়— দুর্বল ও ধার করা চিত্রনাট্য। গোটা ছবিটা দেখতে দেখতে বারবার মনে হবে, এই দৃশ্য বা এই প্লট তো আগে বহু ছবিতে দেখা! কখনও স্পষ্ট এভেঞ্জার্স-এর গার্ডিয়ান অফ দ্য গ্যালাক্সি ২-এর ইন্ট্রো সিন-এর আকশন দৃশ্য প্রায় টুকে দেয়া হয়েছে এখানে। ছোট্ট 'গ্রুট'-এর বদলে ছোটাছুটি করতে দেখা গেল আলিয়ার পোষ্য গিনিপিগকে। আবার কখনও মনে হয়েছে ক্যাপ্টেন আমেরিকা কোনও একশন দৃশ্যের দেশি ভার্সন। আবার কখনও কখনও কোনও নয়া জিনিস দেখে দর্শকের মনে পড়তে বাধ্য প্রফের শঙ্কুর কোনও বিশেষ আবিষ্কারকেও। স্রেফ 'টাফ' দেখানোর অছিলায় প্রত্যেকটি মানুষ মারার পর কপাল থেকে চুল সরিয়ে , অদ্ভুত ভঙ্গিমায় আলিয়ায় বাঁকা হাসি সম্ভ্রমের বদলে বিরক্তির উদ্রেকই বেশি করে।
তারই মাঝে কিছু উজ্জ্বল ব্যতিক্রম অবশ্য আছে। যেমন দিয়া মির্জার সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি। বীর আলফার মায়ের ভূমিকায় তিনি অল্প সময়েই বেশ একটা দাগ কেটে যান। আর আছে আলিয়া-শর্বরীর দুর্দান্ত কিছু ‘ব্যাং-ব্যাং’ অ্যাকশন সিকোয়েন্স, যা বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গেই কোরিওগ্রাফ করা হয়েছে।
যেখানে ‘র’ থাকবে, সেখানে সীমান্তের ওপার থেকে আসা শত্রুরা থাকবে না— তা কি হয়? তাই অবধারিতভাবেই গল্পে হাজির এক পাকিস্তানি গুপ্তচর। নতুনত্ব কিছু পেলেন কি? তার সাথে আছে দেশকে রক্ষা করার জন্য বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দেশপ্রেমিক ভারতীয় জওয়ানরা। ইউরোপের রোদঝলমলে লোকেশনে একটা ভুলে যাওয়ার মতো গান আর নাচ জোর করে গুঁজে দেওয়া হয়েছে— সম্ভবত নায়িকাদের টোনড মিড-রিফ দেখানোর তাগিদে। এর থেকেই স্পষ্ট স্পাই-থ্রিলার ছবিতে জোর করে নাচ-গান ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো যুক্তিহীন বিষয় থেকে আজও বেরোতে পারেনি বলিপাড়া। ঠিক যেমন গোটা ছবি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গোল্ডের অজস্র মন্তাজ। 'আলফা'র মতো সুপার সিরাম নেওয়া আলিয়া বহুদূর থেকে যেখানে কারও পায়ের শব্দ, নিঃশ্বাসের শব্দ ধুনটে পান, সে কী করে টের পেল না কখন তাঁর মাথার পিছনে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে বন্দুক তাকে করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন অনিল কাপুর! আরও আছে। ওই সুপার সিরামের কল্যাণে আলিয়ার সঙ্গে দুর্ধর্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জোয়ান সৈনিকরাও যখন ফেল, তখন তাঁকে কী করে স্রেফ এক হাতে আটকে রাখতে পারে ববি দেওল-এর মতো আরও একজন সাধারণ যোদ্ধা?
ছবির কিছু অংশ অবশ্য বৃষ্টিভেজা চেরাপুঞ্জিতে শ্যুট করা হয়েছে— এই যা একটু নতুনত্ব! কিন্তু বাদবাকি গল্প সেই চেনা ট্র্যাকেই হেঁটেছে— দিল্লির স্যাঁতসেঁতে সরকারি অফিস, গম্ভীর মুখে ফাইল চালাচালি, আর রাজস্থান, লাদাখ বা কাশ্মীরের চেনা উপত্যকায় মিলিটারি হেলিকপ্টার, বাজুকা তাক করা জিপ আর বন্দুকবাজদের লড়াই। চরিত্রদের মুখে কোনো স্বাভাবিক সংলাপ নেই, যেন এক একটা ভারী ভারী ‘সংলাপ’ আউড়ে যাচ্ছেন তারা। আর তার সঙ্গে বোনাস হিসেবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ‘ড্যাডি ইস্যুজ’ ও আবেগের চেনা জোয়ার।
সবচেয়ে বড় চমকটা অপেক্ষা করছিল ছবির দ্বিতীয়ার্ধে। এক মনোরম মনাস্ট্রিতে আবির্ভাব ঘটে স্পাই ইউনিভার্সের পুরনো খিলাড়ি কবীরের (হৃতিক রোশন)। তিনি এসেছেন মেয়েদের উদ্ধার করতে। এবং বিশ্বাস করুন আর নাই করুন— ছবিতে তাঁকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘মঙ্কজি’ বলে!
এরপর এই ‘মঙ্কজি’ আর মেয়েদের নিয়ে যে অ্যাকশন দৃশ্যটি সাজানো হয়েছে, তা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় পরিচালক ‘জন উইক’ ছবি থেকে ভাল রকম অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। অ্যাকশন শেষে তাঁর নির্দেশ— “এবার তোমরা এস।” শুধু তিনি নন, ‘র’ চিফ থেকে শুরু করে বাকি পুরুষ চরিত্ররাও যেন সারাক্ষণ এই দুই দুর্ধর্ষ মহিলা এজেন্টকে স্রেফ হুকুম দিয়ে গেলেন।আসল খটকাটা ঠিক এখানেই - যে ছবি আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করছে যে একজন মহিলা এজেন্ট একাই আস্ত একটা ল্যাবরেটরি সহ বিশাল সুপারস্ট্রাকচার উড়িয়ে দিতে পারে, সেই দুর্ধর্ষ অ্যাসাসিন মিশন শেষ হতেই পুরুষ বসের আদেশের সামনে লক্ষ্মী মেয়ের মতো মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে?
ছবিটা যদি ‘পাঠান’-এর মতো কমিক-বুক স্টাইলের হতো, যেখানে লজিককে ছুটি দিয়ে স্রেফ হাই-ভোল্টেজ অ্যাকশন উপভোগ করা যায়, তবে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু ‘আলফা’ দর্শককে বাধ্য করে গল্পটাকে সিরিয়াসলি নিতে। আর ঠিক এখানেই জোর মার খেয়ে গেছে ছবিটা।
সব মিলিয়ে, যে ছবি জমজমাট হতে পারত, তা শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত একঘেয়ে এবং ম্যাড়মেড়ে একটা অভিজ্ঞতায় পরিণত হল। আলিয়া-শর্বরীর পর্দার লড়াইটা সত্যিই প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু নড়বড়ে চিত্রনাট্যের চোরাবালিতে হারিয়ে গেল ‘আলফা’র গর্জন।
















