মিল্টন সেন: গোষ্ঠী কোন্দল প্রকাশ্যে। এবার পদত্যাগ করেছেন হুগলি জেলা বিজেপি সভাপতি গৌতম চ্যাটার্জী। বিষয়টি প্রকাশ্যে আনা না হলেও শনিবার জেলা বিজেপি নেতৃত্ব সূত্রে জানা গিয়েছে, গৌতম বাবু পদত্যাগ পত্র পাঠিয়েছেন। তবে সেটা শর্তাধীন! গৌতম চ্যাটার্জির দাবি, প্রাক্তন জেলা সভাপতি সুবীর নাগকে চুঁচুড়া বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী করা হলে চাঁর পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করা হোক। এই মর্মে শুক্রবার রাতে কেন্দ্রের দায়িত্ত্বপ্রাপ্ত রাজ্যের মুখ্য আভারি সুনীল বনসলকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বিজেপি হুগলি জেলা সভাপতি গৌতম চ্যাটার্জী।
তবে পদত্যাগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনা হয়নি। পদত্যাগপত্রে গৌতম বাবু বলেছেন, জেলা সদর চুঁচুড়া বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য সুবীর নাগের কথা ভাবছে দলীয় নেতৃত্ব। এটাকে তিনি কিছুতেই মেনে নেবেন না। সুবীরকে চুঁচুড়ায় প্রার্থী করা হলে তিনি সভাপতি থাকবেন না। তাঁর পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করা হোক। কৌশলগতভাবে দলীয় নেতৃত্বের উপর চাপ সৃষ্টি করতেই জেলা সভাপতির এই উদ্যোগ, মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।
জেলা সদর চুঁচুড়া কেন্দ্রে প্রার্থী পদের দৌড়ে বিশেষ চর্চিত সুবীর নাগ, দীপাঞ্জন গুহ-র নাম। প্রাক্তন জেলা সভাপতি সুবীর নাগের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল নয় রাজ্য সম্পাদক দীপাঞ্জন গুহ-র। জেলা বিজেপিতে দুই গোষ্ঠী হিসেবেই চিহ্নিত এই দু'জন। দু'জনের দ্বন্দ্বে জর্জরিত গোটা জেলা বিজেপি, যা সর্বজন বিদিত। একই দলের যুযুধান দুই গোষ্ঠীর, দুই নেতা চুঁচুড়া শহরেরই বাসিন্দা।
জেলা বিজেপি সূত্রে খবর, দীপাঞ্জন বাবুর পাল্লা কিছুটা হলেও ভারি। কারণ, প্রথমত তিনি বিজেপি রাজ্য সম্পাদক। পাশাপাশি তাঁর গোষ্ঠীতে রয়েছে খোদ জেলা বিজেপি সভাপতি, জেলা সম্পাদক-সহ বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট। দীপাঞ্জন বাবু গত ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে চন্দননগর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। ফলত তাঁর নাম ওই বিধানসভা কেন্দ্রের জন্যই ভেবেছিল বিজেপি নেতৃত্ব।
যেহেতু গত বিধানসভা নির্বাচনে চুঁচুড়া আসনে প্রতিদ্বন্ধিতা করেছিলেন সাংসদ লকেট চ্যাটার্জী, তাই দাঁড়ানোর সুযোগ পাননি সুবীর বাবু। তাই এবারে তিনি চুঁচুড়া আসনে প্রার্থী পদের দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে। দীপাঞ্জন বাবুর সমস্যাটা অন্য জায়গায়। তৃণমূল থেকে অপসারিত ছাত্রনেতা সম্বুদ্ধ দত্তকে সম্প্রতি যুব মোর্চার জেলা সভাপতি পদের দায়িত্ত্ব দেয় বিজেপি রাজ্য নেতৃত্ব। তখনই সম্বুদ্ধ দত্তর বিরোধিতায় সরব হয় দীপাঞ্জন গোষ্ঠী। ক্ষোভ বিক্ষোভ, দলীয় কার্যালয় ঘেরাও, সমাজ মাধ্যমে নানান মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। অনুগামীদের নিয়ে দুই গোষ্ঠী হাজির হয় জেলা বিজেপি অফিসে। পরিস্থিতি দুই গোষ্ঠীর হাতাহাতি পর্যন্ত পৌঁছয়।
এই নাটক প্রায় দু'দিন চলার পর রাজ্য নেতৃত্বের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি সাময়িক স্বাভাবিক হলেও, মেটেনি। সেই ঘটনার পর থেকে স্বাভাবিক কারণেই দীপাঞ্জন বাবুর সঙ্গে যুব মোর্চার বর্তমান সভাপতির সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকে। বাক্যালাপ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছে দু'জনের মধ্যে। সম্বুদ্ধ দত্ত আদতে চন্দননগরের বাসিন্দা। সেখানে তাঁর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।
একইসঙ্গে বিজেপি সূত্রে জানা যায়, সম্বুদ্ধ বাবুও নাকি চন্দননগর কেন্দ্রে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই খবর পাওয়ার পর দীপাঞ্জন বাবু ধরেই নিয়েছেন তাঁকে সেখানে মেনে নেওয়া হবে না। তাই তিনি চন্দননগরে দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ চন্দননগরে গিয়ে প্রচার চালানোর ক্ষেত্রে তাঁরই দলের যুব মোর্চার সভাপতি পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে। এদিকে ফাঁকা পরে রয়েছে সিঙ্গুর, হরিপাল, উত্তরপাড়া বিধানসভা কেন্দ্র। সিঙ্গুর কেন্দ্রে লকেট চ্যাটার্জির প্রভাব রয়েছে। প্রাক্তন সাংসদ লকেট চ্যাটার্জির সঙ্গে তার সম্পর্ক ভাল নয়। ফলে সেখানেও তিনি দাঁড়াতে চাইছেন না। বাকি রইল হরিপাল এবং উত্তরপাড়া। এই দুই কেন্দ্রে তাঁর তেমন প্রভাব বা পরিচিতি নেই বললেই চলে। তাই চুঁচুড়া কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া দীপাঞ্জন বাবুর কাছে আর কোনও উপায় নেই।
ফলে কৌশলে সুবীর নাগকে সরাতে জেলা সভাপতির পদত্যাগ পত্রকে হাতিয়ার করে ব্যবহার করে উচ্চ নেতৃত্বের উপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাচ্ছেন দীপাঞ্জন বাবু। এক্ষেত্রে নির্বাচনের আগে জেলা সভাপতির পদত্যাগ পত্র অবশ্যই নেতৃত্বের কাছে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে পদত্যাগ পত্র গৃহীত হয়ে গেলে যন্ত্রণা বাড়বে রাজ্য সম্পাদক এবং জেলা সভাপতি দু'জনের। এবার দেখা যাক, কেন্দ্রের দায়িত্ত্বপ্রাপ্ত রাজ্যের মুখ্য আভারি সুনীল বনসল বিষয়টাকে কীভাবে সামাল দেন।
