আজকাল ওয়েবডেস্ক: লড়াই লড়াই আর লড়াই। অবশেষে যুদ্ধজয়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তনের কারিগর শুভেন্দু অধিকারী। তাই বিজেপি নেতৃত্ব, বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বেছে নিলেন কাঁথির অধিকারী পরিবারের মেজ ছেলে শুভেন্দুকেই। 

অবিভক্ত মেদিনীপুরে কাঁথির এক রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করা শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবন প্রায় সাড়ে তিন দশকের।
রাজনৈতিক জীবনে নিজেকে ধাপে ধাপে মেলে ধরে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন শুভেন্দু। 

মেদিনীপুরের প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা শিশির কুমার অধিকারীর ছেলে হিসেবে তৃণমূল স্তরের রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সালে কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর হিসেবে। 

১৯৯৯ সাল থেকে তৃণমূলের হয়ে টানা কাজ করতে থাকেন শুভেন্দু। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বাবা শিশির অধিকারীও। ১৯৯৯ সালে কাঁথি কেন্দ্র থেকে লোকসভা ভোটে জেতেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী নীতিশ সেনগুপ্ত। সেই জয়ে বড় অবদান ছিল অধিকারী পরিবারের। এরপর ২০০১ সালে মুগবেড়িয়া বিধানসভা কেন্দ্রে শুভেন্দুকে প্রার্থী করেন তৃণমূল নেত্রী। কিন্তু তৎকালীন বামেদের মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দের কাছে হেরে যান শুভেন্দু। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে লোকসভা ভোটে তমলুক কেন্দ্র থেকে লড়াই করেন শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু এবারও সিপিআইএম-এর লক্ষ্মণ শেঠের কাছে ফের একবার পরাজিত হন তিনি।

এরপর ২০০৬ সালে দক্ষিণ কাঁথি থেকে প্রথমবার বিধানসভায় পদার্পণ। এরপর ২০০৭। নন্দীগ্রাম ভূমি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গোটা রাজ্যে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পান শুভেন্দু অধিকারী। ২০০৭ সালে ২৫ নভেম্বর নন্দীগ্রামে তৃণমূল কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ ওঠে সিপিআইএমের বিরুদ্ধে। সেই সময় রুখে দাঁড়িয়েছিল কাঁথির অধিকারী পরিবার। 

২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে শুভেন্দুর নেতৃত্বে ম্যাজিক হয়। প্রবল পরাক্রমশালী বামেদের হারিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ দখল করে তৃণমূল কংগ্রেস। ওই বছরই শুভেন্দু অধিকারীকে যুব তৃণমূলের সভাপতি করেন মমতা। 

এরপর ২০০৯, লোকসভা ভোটে তমলুক থেকে লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে  প্রথমবারের জন্য সাংসদ হন শুভেন্দু অধিকারী। সে বছর কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যান পদেও শিশির অধিকারীর স্থলাভিষিক্ত হন শুভেন্দু।  

২০১১ সাল। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাটে পালাবদল ঘটে। মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে ৩৪ বছরের ক্ষমতাসীন বামেদের হারিয়ে দেয়  তৃণমূল কংগ্রেস। মেদিনীপুরে প্রতাপ বাড়ে অধিকারীদের। ২০১৪ সালের লোকসভায় প্রত্যাশা মতোই পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি তমলুক কেন্দ্র থেকে জেতেন শুভেন্দু অধিকারী। 

কিন্তু, ওই বছরই যুব তৃণমূলের সভাপতি পদে শুভেন্দুকে সরিয়ে বসানো হয় সৌমিত্র খাঁ-কে। পাশাপাশি অভিষেক ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৈরি হয়  তৃণমূল ‘যুবা’। যা নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন শুভেন্দু বলে শোনা যায়।

২০১৬ সালের বিধানসভা ভোট। নন্দীগ্রাম থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন শুভেন্দু অধিকারী। মমতা ব্যানার্জির মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয় অধিকারী পরিবারের মেজ ছেলের। মেলে পরিবহণ ও সেচ দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব।

২০১৯-এর লোকসভা ভোট। সেবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় তৃণমূলের ফল ভাল হয়নি। উত্থান ঘটে বিজেপির। ফলে মমতা ব্যানার্জি, দলের পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব থেকে শুভেন্দুকে সরিয়ে দেন। চিড় ধরে তৃণমূলের সঙ্গে শুভেন্দুর সম্পর্কে। এরপর ২০২০-র অগস্টে তৃণমূলের রাজ্য সরকারি কর্মী সংগঠনের দায়িত্ব থেকে সরানো হয় তাঁকে। তুলে দেওয়া হয় জেলা পর্যবেক্ষকের পদও। উল্লেখ্য, সেই সময় একাধিক জেলার পর্যবেক্ষক পদে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ফলে পদগুলি হারান তিনি।

দলের সঙ্গে ফাটল চওড়া হলে মন্ত্রীসভা, বিধায়ক পদ ও তৃণমূলের সব দায়িত্ব ছেড়ে দেন শুভেন্দু অধিকারী। এরপর ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি-তে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। 

এরপর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পদ্ম প্রতীকে নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হন শুভেন্দু অধিকারী। হারান তৃণমূল প্রার্তী মমতা ব্যানার্জিকে। তবে বিজেপির ফল আশাতীত হয়নি। ফলে বিরোধী দলনেতা হন তিনি। 

এরপর মমতা সরকার ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন শুভেন্দু। রাজ্যজুড়ে চষে বেরিয়েছেন। ফল মিলল হাতে নাতে। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর, দুই বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জিতেছেন কাঁথির এই ছেলে। ভবানীপুরে মমতাকে হারিয়ে 'জায়ান্ট কিলার' শুভেন্দু অধিকারী। 

ফলে সাংগঠনিক দক্ষতার সঙ্গেই প্রসানিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শুভেন্দুকেই বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বেছে নিলেন অমিত শাহ-সহ বিজেপি নেতৃত্ব। অধিকারীর হাতেই রইল বাংলার অধিকারের রাশ।