প্রণব কান্তি বসু
দীর্ঘ পনেরো বছর শাসন করার পর বর্তমান তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের নানা ক্ষোভ সঞ্চারিত হওয়া স্বাভাবিক। যার অনেকটাই সংগতও বটে, যেমন দুর্নীতি, অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, ইত্যাদি। তবে প্রধান বিরোধী দল বিজেপিও কিন্তু দীর্ঘ দিন কেন্দ্রে এবং নানা রাজ্যে ক্ষমতাসীন। তাই অন্যান্য রাজ্য এবং কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর কাজের নমুনা দেখে তারপর যাচাই করাটাই বোধহয় সংগত হবে।
বিজেপির সবচেয়ে নজরকাড়া প্রতিশ্রুতি অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে প্রত্যেক মহিলাকে মাসে ৩০০০ টাকা দেওয়ার ‘সংকল্প’। এটা অবশ্যই ১৫০০ টাকার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রতিস্পর্ধী প্রতিশ্রুতি। তবে এই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহের জায়গা রয়েছে। কারণ, বিজেপি শাসিত কোনও রাজ্যে এমন কোন প্রকল্প চালু হয়নি। বিধবা ভাতা এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে বিশেষ বর্গের মহিলাদের কিছু অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়। তবে বাংলায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মত মহিলাদের সর্বজনীন প্রকল্প বিজেপি শাসিত কোনও রাজ্যে নেই।
সংকল্প পত্রে বিজেপি কথা দিয়েছে প্রত্যেক গর্ভবতী মহিলাকে ২১,০০০ টাকার আর্থিক সাহায্য এবং ছ’টি পুষ্টি সরঞ্জামের কিট দেওয়ার। এই প্রতিশ্রুতি নিয়েও যথেষ্ট সংশয় থেকে যায়। বিজেপি শাসিত কোনও রাজ্যেই এমন প্রকল্প চালু নেই। কেন্দ্রের অবশ্য একটি প্রকল্প রয়েছে প্রধানমন্ত্রী মাতৃবন্দনা যোজনা।এই প্রকল্পের অধীনে প্রথম সন্তান ধারণের জন্য তিন কিস্তিতে ৫০০০ টাকা দেওয়া হয়। তবে এটা তো রাজ্যে কে ক্ষমতায় এল তার সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত নয়। যেহেতু এটা কেন্দ্রের প্রকল্প, ফলে এটা সমস্ত রাজ্যের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আরও লক্ষ্য করার মত যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া পরিমাণের তুলনায় এই প্রকল্পে অনুদান অনেক কম।
যুব সম্প্রদায়কে বিশেষ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের। এই প্রতিশ্রুতি কতটা বিশ্বাসযোগ্য তা অনুমান করা মুশকিল। কারণ, কোন ক্ষেত্রে কত কর্মসংস্থান হবে তাও স্পষ্ট করে জানানো হয়নি। তবে এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে কারণ খোদ কেন্দ্রেই প্রচুর শূন্যপদ পরে আছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী শুধু রেলেই ১.২ লক্ষের বেশি শূন্যপদ পরে রয়েছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ১.৫৫ লক্ষ শূন্যপদ রয়েছে।
এর পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গে নারী নিরাপত্তা নিয়ে বিজেপি বহুদিন ধরেই সরব। এবার নির্বাচনের আগে বিজেপির প্রকাশ করা সংকল্প পত্রে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে মহিলাদের সুরক্ষার জন্য দুর্গা স্কোয়াড নামে মহিলা পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠনের। এটা ঠিক যে আমাদের সংস্কৃতি বদলেছে, যা অভয়ার ধর্ষণ ও খুনের মত ঘৃণ্য ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এর নানা কারণ থাকতে পারে। যেমন, বিনোদন জগতের প্রভাবে দেশব্যাপী পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ক্রুর অনুকরণ বাংলার গ্রামীণ সমাজেও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এমন ভাবার কোন কারণ নেই যে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি মহিলাদের জন্য স্বর্গ রাজ্য। আর পশ্চিমবঙ্গে মহিলারা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকেন।
এটা ঘটনা, বাংলায় মহিলাদের সুরক্ষা গর্ব করার মত নয়।হারের বিচারে (এক লক্ষ মহিলার মধ্যে হেনস্থার শিকারের সংখ্যা) সরকারি এনসিআরবি-এর তথ্য অনুসারে সমস্ত রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে নবম স্থানে। এই রাজ্যের থেকে বেশী নারী নিগ্রহের হার যে আটটি রাজ্যে রয়েছে তার সাতটিই বিজেপি শাসিত। ধর্ষণের হিসাবে, ওই একই সরকারি সূত্র বলছে, প্রথম পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে (যাতে পশ্চিমবঙ্গ নেই) চারটিই বিজেপি শাসিত। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বড় শহরগুলির মধ্যে সবচেয়ে কম ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কলকাতাতেই। একটা সংগত প্রশ্ন অবশ্যই থেকে যায়, সমস্ত নির্যাতন আর ধর্ষণের ঘটনা তো প্রকাশ্যে আসে না, সেটা সামাজিক লজ্জায় হোক বা ভয়ে। তবে এই সমস্যা তো শুধু বাংলায় নয়, গোটা দেশেই রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে, যারা বর্তমানে নিজেদের শাসন করা রাজ্যে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না, তাদের মুখে পশ্চিমবঙ্গে নারী সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি খুব একটা ভরসা যোগায় না। আর দুর্গা ব্যাটালিয়ন গঠনের বিজেপির সংকল্পও একটু ভয় ধরাচ্ছে। কারণ, সঙ্ঘ পরিবারের দুর্গা বাহিনীর নানা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়ানোর অভিযোগ আছে। আমাদের রাজ্যেও এদের তাণ্ডব আমরা দেখেছি।
বাকি সংকল্পগুলি অনেকটাই অকিঞ্চিৎকর। যেমন, যেখানে বিজেপির সমর্থক বেশী, সেই সমস্ত কেন্দ্রে বিশেষ সুবিধা প্রদানের আশ্বাস অথবা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির অঙ্গ। এর মধ্যে রয়েছে অভিন্ন দিওয়ানী বিধি চালু। রয়েছে হিন্দুদের ধর্মস্থানকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় পর্যটনের পরিকল্পনা। উত্তরবঙ্গে এইমস, আইআইএম, আইআইটি তৈরির প্রতিশ্রুতি রয়েছে। অভিন্ন দেওয়ানী বিধি এবং ধর্মীয় স্থানকেন্দ্রিক পর্যটন সম্বন্ধে প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য। তবে এইমস, আইআইএম, আইআইটি তৈরি হলেও সেগুলির মান কীরকম হবে তা নিয়েও সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। যেমন, কল্যাণীতে এইমস তৈরি হয়েছে বটে কিন্তু তা এখনও পুরোদমে চালু করা হয়নি। চিকিৎসার পরিকাঠামোর এখনও অনেক উন্নতি দরকার। প্রচুর চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য সহায়ক পদ এখনও খালি রয়েছে।
অর্থাৎ, প্রতিশ্রুতি যাই হোক তার ওপর ভরসা করে ভোটদান খুব একটা যুক্তিসঙ্গত হবে বলে মনে হয় না। এবার নির্বাচনের প্রধান ইস্যু রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পক্ষে। আর প্রধান বিরোধী দল হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে। প্রতিশ্রুতিপত্রে শক্তিপীঠ সার্কিট ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সার্কিট তৈরির সংকল্প এটারই ইঙ্গিত। তাছাড়া এই নির্বাচনে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৫% ভোটদাতার নাম বাদ পড়া। এসআইআরের ন্যায্যতা যাই হোক না কেন, যেটা প্রাসঙ্গিক সেটা হল বিজেপি নেতৃত্ব অবিচল ভাবে এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেছে। আর বাদ দেওয়ার পিছনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, তারা বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা অনুপ্রবেশকারী। গত ১১ এপ্রিল, জঙ্গিপুরের জনসভা থেকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করলেন যে পশ্চিমবঙ্গে ‘বাঙালিদের সংখ্যালঘু হতে দেবেন না’। অর্থাৎ, বিজেপির মত এটাই যে বাঙালি মুসলমান হতে পারে না। হিন্দুদের সংখ্যালঘু হওয়ার কৌমী সংঘাত উত্তেজক সম্ভাবনা যে কতগুলো ভুল তথ্যের ওপর গঠিত, সে বিষয়ে আলোচনা এই প্রেক্ষিতে অপ্রাসঙ্গিক বলে বাদ দিলাম। তবে একটা সতর্কবাণী আবশ্যিক, যে কোনও কৌমী শাসন ব্যক্তি স্বাধীনতা ভিত্তিক গণতন্ত্র বিরোধী।
(প্রণব কান্তি বসু বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক৷ লেখাটি লেখকের ব্যক্তিগত মতামত।)














