আশিস ঘোষ 

এবারের ভোটে অনুপ্রবেশ থেকে সিন্ডিকেটরাজ, নারী নিরাপত্তা থেকে কর্মহীনতা, এমন আরও অনেক ইস্যু বিজ্ঞাপনে সামনে আনলেও বিজেপির মূল আখ্যানটা কিন্তু ‘ভয়।’ ভয় থেকে ভরসা।

পদ্মে ছাপ দিলে রাজ্যবাসী ভয় থেকে মুক্তি পাবেন। যে তিনটি জিনিস থাকলে অন্তত রাজনীতিতে কিস্যু হয় না তার শেষেরটা হল ভয়। তার আগের দুটো হল লাজ আর লজ্জা। কিন্তু তা বলে ভোটারদের ভয় ছাড়া চলবে কী করে! 

ভয় দেখাতে হবে এবং ভয় থেকে মুক্তির কথাও বলে যেতে হবে সমান দমে। এবারের পদ্মশিবিরের প্রচারের মূল ইস্যু ভয়। গত পনেরো বছর ধরে রাজ্যের শাসক দল যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে বিজেপি ক্ষমতায় এলে তা দূর করবে।

ইস্তেহারে নানারকম হাতেগরম প্রতিশ্রুতি থাকলেও আসল কথাটা হল ওই ভয়মুক্তির আশ্বাস। মোদ্দা কথা, গত পনেরো বছর বাঙালি সর্বগ্রাসী ভীতির মধ্যে রয়েছেন। সেই দুরবস্থা থেকে বাঁচাবে পদ্ম।

রাতে মহিলারা নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে পারবেন, সিন্ডিকেটের তোলাবাজির ভয়, ঘুষ দিয়ে চাকরি না পাওয়ার ভয়, পাড়ার দাদাদের ভয়, এসব থেকে মুক্তি দেবেন শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র মোদি। একবার বোতাম টিপলেই মুশকিল আসান। ভয় আউট ভরসা ইন।

এতো গেল ভয় পাওয়া বাঙালির কথা। কিন্তু ভয় দেখানো? সেটার কী হবে? যেসব কথা গত মাসতিনেক ক্রমাগত বলে আসছেন বিজেপির নেতারা, তাতে ভয় পাওয়াই তো স্বাভাবিক।

বেছে বেছে ঘুষপেটিয়া অনুপ্রবেশকারীদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের দেওয়া হবে। এ কথা যেমন পাড়ার দু’আনা চারআনা নেতারা গলা চড়িয়ে বলে বেরিয়েছেন তেমনই দিল্লি থেকে এসে আরও ওজনদার নেতারা হিন্দিতে একইভাবে শাসিয়ে গিয়েছেন।

ফলে এসআইআর শুরু হতেই ভয় গাঢ় হয়েছে। যত দিন গড়িয়েছে ততই সেই ভয় চেপে বসেছে। কেউ গলায় দড়ি দিয়েছেন, কেউ ভয়ঙ্কর চাপে অসুস্থ হয়ে অকালে জীবন হারিয়েছেন।

অনেকেই পুরনো বাক্সপ্যাটরা নামিয়ে এনে তন্নতন্ন করে খুঁজে গিয়েছেন তাঁদের নাগরিক হওয়ার প্রমাণ। দরজায় দরজায় ঘুরেছেন। সব কাজ ছেড়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। আরও বেশি আতঙ্ক নিয়ে ফিরে এসেছেন। 

এই ভয়টার কী হবে? মানুষ যত হেনস্তা হয়েছেন ততটাই নির্বিকার বিরোধী নেতারা। কেউ ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ যাওয়াকে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনারের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

এত অসংবেদনশীল কথাবার্তা তাঁদের আরও ভীত করেছে। তাঁরা এক এক সময়ে এক একরকম ফরমানে বিভ্রান্ত হয়েছেন। প্রথমে লিস্টে নাম আছে কিনা সেই নিয়ে আতঙ্ক।

তারপর তলব পেয়ে নথিপত্র জোগাড় করে জমা দেওয়ার জন্য হা পিত্যেস লাইন। তারপরে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে কেবল বাংলার ভোটারদের চরম হয়রানি। কোথাও এক পরিবারের একজনের নাম আছে তো বাকি তিনজনের নাম নেই। কোথাও পাড়াকে পাড়া উধাও হয়েছে নিবিড় সংশোধনের নামে।

কাঁচি চলেছে মুসলিম, মহিলা, মতুয়াদের নামে। বাদ পড়েননি হিন্দুরাও। এই ব্যাপক নাম সংহার যে নিবিড় ভয়ের জন্ম দিল, তাকে ভয় না ভরসা কোন দিকে রাখব? পদ্মনেতারা কি বলতে পারবেন?

লেখাটি লেখকের ব্যক্তিগত মতামত।