আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটানোয় ভারতের বাসমতি চাল রপ্তানিকারীরা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। একসময় ভারতীয় বাসমতির সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল ইরান, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে দেশটির চাহিদা কমেছে এবং সবশেষ এই অস্থিরতা রপ্তানিকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
একসময় ইরান ছিল একটি প্রধান ক্রেতা:
বহু বছর ধরে ইরান ভারতের কৃষি পণ্যের, বিশেষ করে বাসমতি চালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার ছিল। তবে দেশটির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ক্রমবর্ধমান বাহ্যিক চাপ বাণিজ্যের মসৃণতা ব্যাহত করেছে। যে বাজারটি একসময় স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য ছিল, এখন সেখানে চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
কয়েক বছর আগেও ভারতীয় বাসমতির ক্রেতাদের তালিকায় ইরান শীর্ষে ছিল। আজ তৃতীয় অবস্থানে নেমে এসেছে। রপ্তানিকারীরা আশঙ্কা করছেন যে, পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত না হলে আগামী মাসগুলোতে চালানের পরিমাণ আরও কমে যেতে পারে।
পেমেন্ট আটকে আছে, রপ্তানিকারীরা উদ্বিগ্ন:
রপ্তানিকারীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হল দেরিতে পেমেন্ট। বেশ কয়েকজন ভারতীয় চাল রপ্তানিকারক জানিয়েছেন যে, তাদের টাকা আটকে আছে এবং চালানের চালানগুলো ইরানি বন্দরে পড়ে আছে। এর প্রতিক্রিয়ায়, ইন্ডিয়ান রাইস এক্সপোর্টার্স ফেডারেশন একটি পরামর্শ জারি করে রপ্তানিকারীদের ইরান থেকে ক্রেতাদের সঙ্গে লেনদেনের সময় অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে বলেছে।
শিল্প ক্ষেত্রের অনুমান অনুসারে, বর্তমানে ১,৫০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের বাসমতির চালান আটকে আছে, যা নগদ প্রবাহের উপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং ব্যবসার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
প্রধান বাজার চাপের মুখে:
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারত ২০২৪-২৫ সালে ইরানে ৮,৮৯৭ কোটি টাকার কৃষি পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে শুধু বাসমতি চালের পরিমাণ ছিল ৬,৩৭৪ কোটি টাকা। ভারতের মোট বাসমতি রপ্তানিতে ইরানের অংশ প্রায় ১২.৭ শতাংশ, তবে এটি আরও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মানের তীব্র পতনের কারণে আমদানিকারকদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছে। এর ফলে তাদের পক্ষে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের সময়মতো অর্থ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মুদ্রার পতন এবং বিশ্বের চাপ সমস্যা আরও বাড়িয়েছে:
মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের তীব্র পতন পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। অনেক আমদানিকারক তহবিল সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন, যার ফলে চুক্তি বিলম্বিত বা বাতিল হচ্ছে। ইরান থেকে পণ্য আমদানিকারী দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর চাপ আরও বেড়েছে। যদি রপ্তানি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত থাকে, তবে হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের চালকল মালিকরা প্রথমে এর প্রভাব অনুভব করবেন। কম চাহিদার কারণে শেষ পর্যন্ত কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এবং দামের ওপর চাপ পড়তে পারে।
আগে রপ্তানি বাড়লেও, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দুর্বল:
আকর্ষণীয়ভাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ভাগে ইরানে বাসমতি চালের রপ্তানি বেশি ছিল। এপ্রিল থেকে নভেম্বর ২০২৫-২৬ সময়ের মধ্যে ভারত ইরানে ৫.৯৯ লক্ষ মেট্রিক টন বাসমতি চাল রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের ৪.৯৫ লক্ষ মেট্রিক টনের তুলনায় বেশি। তবে, রপ্তানিকারকরা আশা করছেন যে- চলমান অস্থিরতার কারণে ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬-এর মধ্যে চালানের পরিমাণ কমে যাবে। অর্থ পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক রপ্তানিকারক নতুন ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক।
কয়েক বছর ধরে চাহিদা কমছে:
বাসমতি চালের ক্রেতা হিসেবে ইরানের দোদুল্য়মান অবস্থান নতুন নয়। ২০১৮-১৯ সালে, ভারতের বাসমতি রপ্তানির ৩৩ শতাংশেরও বেশি হত ইরানে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে এই অংশীদারিত্ব ক্রমাগত কমেছে।
আমদানি ২০১৮-১৯ সালের প্রায় ১৪.৮ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে কমে ২০২৪-২৫ সালে মাত্র ৮.৫ লক্ষ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবণতাই ইঙ্গিত যে, কীভাবে অর্থনৈতিক চাপ ধীরে ধীরে প্রিমিয়াম চাল কেনার ক্ষেত্রে ইরানের ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।
চা এবং অন্যান্য রপ্তানিও ঝুঁকিতে:
এই প্রভাব শুধু বাসমতি চালেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরান ভারতীয় চায়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা, যা ২০২৪-২৫ সালে প্রায় ১১,০০০ টন চা আমদানি করেছে। চা রপ্তানিকারকরাও এখন বিলম্বে অর্থ পরিশোধ এবং চাহিদা কমে যাওয়া নিয়ে সমানভাবে উদ্বিগ্ন।
আপাতত, রপ্তানিকারীরা সতর্ক । ইরানের পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত, একসময়ের শক্তিশালী এবং নির্ভরযোগ্য বাজার আপাতত অনিশ্চিতই থেকে যেতে পারে।
