আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতীয় পরিবারের কাছে সোনা বরাবরই শুধু একটি মূল্যবান ধাতু নয়, বরং আবেগ, ঐতিহ্য এবং আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক। বিয়ের গয়না, উৎসবের উপহার কিংবা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উত্তরাধিকার হিসেবে সোনা সংরক্ষণের রীতি বহুদিনের। এক সময় পরিবারের সোনার গয়না বিক্রি করা মানেই বড় কোনও আর্থিক সংকট, চিকিৎসার খরচ বা ঋণ শোধের মতো জরুরি পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিত।
তবে সময়ের সঙ্গে সেই মানসিকতায় বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে সোনার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর বহু ভারতীয় এখন সোনাকে শুধু অলংকার হিসেবে নয়, লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবেও দেখতে শুরু করেছেন। ফলে লকারে বছরের পর বছর পড়ে থাকা পুরনো গয়না এখন অনেকেই বিক্রি করছেন, আবার কেউ বদলে নিচ্ছেন নতুন ডিজাইনের হালকা গয়না। অনেকেই বাড়তি দামের সুযোগ নিয়ে সরাসরি লাভও তুলছেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতীয়দের কাছে সোনার গুরুত্ব কমে গেছে। ধনতেরাস, অক্ষয় তৃতীয়া কিংবা বিয়ের মরসুমে এখনও সোনার চাহিদা বিপুল। সোনা এখনও সমৃদ্ধি, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক। তবে এর পাশাপাশি মানুষ এখন সোনাকে শেয়ার বাজার, মিউচুয়াল ফান্ড বা বন্ডের মতো একটি বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করছেন।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির ব্যাপক হারে সোনা কেনার ফলে গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম দ্রুত বেড়েছে। ভারতে সেই প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে। চলতি বছরে দেশীয় বাজারে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম প্রায় ১.৯ লক্ষের রেকর্ড ছুঁয়েছে। ফলে বহু পরিবারের কাছে বহু বছর ধরে সংরক্ষিত গয়নার বর্তমান মূল্য প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাজারের পরিসংখ্যানেও। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ ত্রৈমাসিকে ভারতে প্রথমবারের মতো গয়নার তুলনায় বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বেশি সোনা কেনা হয়েছে। এই সময়ে বিনিয়োগের জন্য সোনার চাহিদা ৫৪ শতাংশ বেড়ে ৮২ টনে পৌঁছেছে। অন্যদিকে গয়নার চাহিদা ১৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬৬ টনে।
একই সময়ে গোল্ড বার, কয়েন এবং গোল্ড এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডের জনপ্রিয়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গোল্ড ইটিএফে বিনিয়োগ এক বছরে ১৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটাল গোল্ড, মোবাইল অ্যাপ এবং অনলাইন বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এখন তরুণ প্রজন্ম সহজেই সোনায় বিনিয়োগ করছে। ফলে সোনা এখন শুধু লকারে নয়, বিনিয়োগের পোর্টফোলিওতেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিচ্ছে।
ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সোনার উপর আস্থা বজায় রেখেছে। বর্তমানে সোনার মজুত ৮৮০ টনেরও বেশি, যা প্রমাণ করে যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সোনার গুরুত্ব এখনও অটুট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে সোনার সাংস্কৃতিক ও আবেগগত মূল্য এখনও অপরিবর্তিত। তবে বড় পরিবর্তন এসেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে। এখন সোনা শুধু ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় নয়, বরং সঠিক সময়ে লাভ তোলার একটি কার্যকর বিনিয়োগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। অর্থাৎ, সোনা এখনও ভারতীয়দের কাছে পবিত্র ও মূল্যবান, কিন্তু একই সঙ্গে তা এখন স্মার্ট বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমেও পরিণত হয়েছে।















