শ্রেয়সী পাল: রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে আসন্ন উপ-নির্বাচনের দামামা শুক্রবারই বাজিয়ে দিয়ে গেলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে রেজিনগর এবং নওদা, দু'টি আসনে 'আম জনতা উন্নয়ন পার্টি'র প্রতীকে জয়ী হয়েছিলেন হুমায়ুন কবীর। রেজিনগর আসন থেকে পদত্যাগ করায় আগামী দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে এই আসনে উপ-নির্বাচন হতে পারে। 

সম্প্রতি রেজিনগরের মাটিতে দাঁড়িয়ে হুমায়ুন কবীর যে 'ঘৃণা ভাষণ' দিয়েছিলেন তার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁকে কড়া ভাষায় জবাব দিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী সেদিনই ঘোষণা করেছিলেন, তিনি সাত দিনের মধ্যে মুর্শিদাবাদে আসবেন। 

শুক্রবার দুপুরে মুর্শিদাবাদ জেলায় এসে দু'টি বৈঠক সেরে সন্ধ্যে সাড়ে ছটা নাগাদ মুখ্যমন্ত্রী রেজিনগরের তকিপুর হাই মাদ্রাসা ময়দানে জনসভায় বক্তব্য রাখতে ওঠেন। আজকের জনসভায় হুমায়ুন কবীরের নাম না করে তাঁকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করার পাশাপাশি আসন্ন উপ নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীকে রেজিনগর আসন থেকে জয়ী করার আবেদন জানান। 

শুভেন্দু অধিকারী বলেন, "ফলতা পুনর্নির্বাচনের আগে আমি কথা দিয়ে এসেছিলাম তাদের জন্য 'স্পেশাল প্যাকেজ' দেব।"  রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফলতাবাসী কী কী পেয়েছে তার বিশদ হিসাব দেন মুখ্যমন্ত্রী। এছাড়াও বলেন," আমি নিজেও নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হওয়ার পর ওই আসন ছেড়ে দিয়েছি। সেখানে উপনির্বাচন হবে, তবে তার ফলাফল আমার ওপর ছেড়ে দিন। সেখানে বিপুল ভোটে জয়ী হব। তকিপুর মাদ্রাসার মাঠে উপস্থিত জনতার কাছে তিনি প্রশ্ন রাখেন, 'রেজিনগর দেবেন তো?'"
 
মুখ্যমন্ত্রী বলেন," আগামী দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে রেজিনগরে উপনির্বাচন হবে। এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী জয়ী হলে দু'টো ব্রিজ দেব, পরিযায়ী শ্রমিকদেরকে বাড়ি ফেরাব, যত আবাস লাগে দেব, দু'হাত ভরে দেব। নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনের শেষে বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা ২০৮ না ২০৯ হবে তা নির্ভর করবে রেজিনগরের ওপর।" তিনি বলেন," রেজিনগরের মানুষই ঠিক করবে যে ঝগড়া করবে, চমকাবে ধমকাবে, হিন্দু-মুসলমান করবে, মন্দির- মসজিদ করবে তাঁর সঙ্গে থাকবে না উন্নয়নের সঙ্গে থাকবে।  উন্নয়ন যদি চান, আরও স্কুল, কলেজ, কৃষকের অধিকার যদি চান তাহলে পদ্ম ফোটাতে হবে।"
 
মুখ্যমন্ত্রীর সাফ কথা," মুর্শিদাবাদের আটজন বিজেপি বিধায়ক দিয়েছেন। রেজিনগর আমার চাই, যা চাইবেন তাই পাবেন।"

এরপরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী হুমায়ুন কবীরের নাম না করে বলেন, "দম্ভ ভাঙতে হবে, অহংকার ভাঙতে হবে। কিন্তু কার অহংকার কার দম্ভ আমি বললাম না।  অনেক সময় নাম বললে অনেকে হিরো হয়। শান্তি, উন্নয়ন এবং প্রগতি এই তিনটে ইস্যুতে ভোট করুন। দু'মাসের সরকারে হিন্দু এবং মুসলমান সকলে ভাল আছেন তো? আরও ভাল থাকবেন।"
 
রেজিনগরের জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, "পশ্চিমবঙ্গের যে সমস্ত উপভোক্তারা আয়ুষ্মান ভারত কার্ড পাবেন না তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী  স্বাস্থ্য বীমা কার্ড পাবেন। এই কার্ড ব্যবহার করে সারা ভারতে পাঁচ লক্ষ টাকার চিকিৎসা পাওয়া যাবে প্রতিবছর।"
 
এদিনের জনসভা থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর নাম করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, "নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে এই অজুহাতে তাঁরা সিএএ এবং এনআরসি-র সময় আগুন লাগিয়েছিল। আমরা কার নাগরিকত্ব কেড়েছি এবং কাকে দেশ থেকে তাড়িয়েছি এই প্রশ্ন করে দেখার সময় এসেছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন ওয়াকফ সংশোধনী আইন লাগু করতে দেবেন না। কিন্তু তিনি এই আইন রাজ্যে লাগু করে গিয়েছেন। মমতা ব্যানার্জির জন্যই বহু ওয়াকফ জমি এখন খাস জমি হয়ে গিয়েছে।"
 
মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, "প্রচার করা হয়েছিল বিজেপি ক্ষমতায় এলে মুসলিমরা থাকতে পারবে না। দাঙ্গা হবে, প্রার্থনা বন্ধ করে দেওয়া হবে  এবং ধর্ম পালন করতে দেওয়া হবে না, ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হবে। আমরা এই তালিকাটা জানতে চাই। কার সঙ্গে এই আচরণ করা হয়েছে। "

হুমায়ুন কবীরের বিতর্কিত ভাষণের একটি অংশ উদ্ধৃত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,"তাঁর এই কথা সংবিধান স্বীকার করে না। "
 
তকিপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, "এখানে যিনি জিতেছেন তাঁকে বলেছি সংবিধান মেনে উন্নয়নের কথা বলুন। আমি দুর্বল মুখ্যমন্ত্রী নই, আমি মমতা ব্যানার্জির মত কাপুরুষ নই, আপনি যা বলবেন আর আমি শুনে যাব এটা আমার আমলে হবে না।"
 
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "আমার প্রশাসনিক সভায় সমস্ত দলের বিধায়কদের ডাকি। বিধানসভায় সবার কথা শুনি। বন্দে মাতরম গাইব না, জাতীয় সঙ্গীত গাইব না,  ১৫  আগস্ট, ২৬ জানুয়ারি জাতীয় পতাকা তুলব না, পিএফআই, সিমিকে ঢোকাব, যা খুশি করব, পুলিশ শাটারের নীচে ঢুকবে এসব জিনিস এখন অতীত। সকলকে সংবিধান মেনে চলতে হবে।"
 
এরপরই মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন আগামী অগস্ট মাসে তিনি ফের রেজিনগর বিধানসভার অন্তর্গত শক্তিপুরে আসবেন। একটি পুরনো ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, "সেই সময় শক্তিপুরে আমার সভার মাইক খোলা হয়েছিল ,আমাকে মাঠ দেওয়া হয়নি। হাইকোর্টে আবেদন করে সভা করেছিলাম।"
 
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রথমবারের জন্য এসে তিনি যে ভালোবাসা এবং স্নেহ পেয়েছেন তা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "আমি এর জন্য আমি চির ঋণী থাকলাম।  উন্নয়ন দিয়ে এই ঋণ শোধ করব।"