আজকাল ওয়েবডেস্কঃ  ডায়মন্ড হারবারে রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে বড়সড় ধাক্কা খেল তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যের বিধানসভা ভোটের পর গতকাল ফলতায় পুনর্নির্বাচনে ভরাডুবি দলের। দীর্ঘদিন ধরে 'ডায়মন্ড হারবার মডেল' নামে প্রচারিত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত মিলল সোমবার। ডায়মন্ড হারবার পুরসভার মোট ১৬টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৮ জন তৃণমূল কাউন্সিলর একযোগে পদত্যাগপত্র জমা দিলেন মহকুমাশাসকের দপ্তরে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জোর চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা ডায়মন্ড হারবার মহকুমা জুড়ে।


সোমবার দুপুরে ডায়মন্ড হারবার মহকুমাশাসক অয়ন দত্তগুপ্তের কাছে নিজেদের পদত্যাগপত্র জমা দেন ওই কাউন্সিলররা। রাজনৈতিক মহলের মতে, একসঙ্গে এত সংখ্যক কাউন্সিলরের পদত্যাগ শুধুমাত্র প্রশাসনিক ঘটনা নয়, বরং তা ডায়মন্ড হারবারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।

 

মহকুমাশাসক অয়ন দত্তগুপ্ত জানান, “পদত্যাগপত্র আমাদের কাছে জমা পড়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।”

পদত্যাগকারী কাউন্সিলরদের তালিকায় রয়েছেন—
১) অমিত সাহা (১৩ নম্বর ওয়ার্ড)
২) তমাল হালদার (৭ নম্বর ওয়ার্ড)
৩) দেবকী হালদার (১৬ নম্বর ওয়ার্ড)
৪) মঞ্জু মণ্ডল (২ নম্বর ওয়ার্ড)
৫) অলক হালদার (১১ নম্বর ওয়ার্ড)
৬) স্বপন দাস (৯ নম্বর ওয়ার্ড)
৭) মৃদুল হালদার (৮ নম্বর ওয়ার্ড)
৮) দিব্যেন্দু হালদার (১ নম্বর ওয়ার্ড)

 

পদত্যাগকারী কাউন্সিলরদের অভিযোগ, এতদিন ডায়মন্ড হারবার পুরসভা কার্যত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা নয়, বরং পুলিশ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে চলত। সাত নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তমাল হালদার সরাসরি বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে বলেন, “এতদিন ডায়মন্ড হারবার মডেলের নামে একটা বেলুন ফুলিয়ে রাখা হয়েছিল। এখন সেই বেলুন ফুস হয়ে গিয়েছে। আমরা জনপ্রতিনিধি হলেও কোনো স্বাধীনতা ছিল না। সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করত পুলিশ আধিকারিকেরা। তাঁদের নির্দেশেই আমাদের উঠতে বসতে হত।”

তিনি আরও দাবি করেন, উপরতলা থেকে পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করা হত। কাউন্সিলরদের কার্যত পুতুলের মতো ব্যবহার করা হত। প্রতিবাদ করার কোনও পরিবেশ ছিল না। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে সাহস ফিরেছে, তাই এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত। 


শুধু প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ নয়, দুর্নীতির অভিযোগও তুলেছেন একাধিক কাউন্সিলর। তাঁদের দাবি, ডায়মন্ড হারবার এলাকায় পুকুর ভরাট, অবৈধ নির্মাণ, তোলাবাজি—সব ক্ষেত্রেই পুলিশের একাংশের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। কাউন্সিলরদের অভিযোগ, অবৈধ বিল্ডিং তৈরির ক্ষেত্রে মালিকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হত। প্রতিবাদ করলে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হত।


১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অমিত সাহা বলেন, “ডায়মন্ড হারবার পুরসভা ১৬টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এতদিন সব ওয়ার্ড তৃণমূলের দখলে ছিল। কিন্তু আমরা ৮ জন কাউন্সিলর সিদ্ধান্ত নিয়েছি পদত্যাগ করব। এখনও আমাদের মেয়াদ প্রায় আট মাস বাকি রয়েছে। উন্নয়নের বার্তা নিয়েই আমরা এসেছিলাম। কিন্তু যেভাবে দুর্নীতি হয়েছে, তাতে মানুষের সামনে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে উঠছিল।”

 

তিনি আরও বলেন, “পুলিশ প্রশাসনের মাধ্যমে পুরসভা থেকে কোটি কোটি টাকা তোলা হয়েছে। সেই বিষয় আমরা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

 

অমিত সাহার কথায়, “আমরা দুর্নীতির তদন্ত চাই। যদি তদন্তে আমাদের কারোর নাম জড়ায়, তাহলে যে শাস্তি হবে মাথা পেতে নেব। তবে যারা প্রকৃত দোষী, তাদেরও আইনের মুখোমুখি হতে হবে।”

 

পদত্যাগকারী কাউন্সিলরদের দাবি, তাঁরা বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন না। বরং নতুন সরকার যাতে নতুন বোর্ড গঠন করে মানুষের জন্য কাজ করতে পারে, সেই পথ প্রশস্ত করতেই তাঁরা সরে দাঁড়াচ্ছেন। তমাল হালদার বলেন, “বিজেপির দুর্দিনে যারা মাটি কামড়ে লড়াই করেছে, তাদের প্রাপ্য আমরা কেড়ে নিতে চাই না। নতুন সরকার তাদের প্রতিনিধি দিয়ে পুরসভা চালাক। এলাকার মানুষ হিসেবে আমরা সহযোগিতা করব।”


রাজনৈতিক মহলে এই বক্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, একদিকে তাঁরা তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলছেন, অন্যদিকে সরাসরি বিজেপিতে যোগদানের কথাও অস্বীকার করছেন। ফলে এই পদত্যাগ শুধুমাত্র রাজনৈতিক অবস্থান বদলের জন্য, নাকি ভবিষ্যতের বড় কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ—তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী দীপক কুমার হালদার। তিনি বলেন, “ডায়মন্ড হারবার পুরসভায় যদি দুর্নীতি হয়ে থাকে, তাহলে তার তদন্ত অবশ্যই হবে। যারা যুক্ত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দুর্নীতি করে কেউ পার পাবে না।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডায়মন্ড হারবার দীর্ঘদিন ধরেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সেই এলাকায় একসঙ্গে ৮ কাউন্সিলরের পদত্যাগ নিঃসন্দেহে বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে কাউন্সিলরদের মুখে 'পুলিশি নিয়ন্ত্রণ', 'দুর্নীতি', 'তোলাবাজি'র মতো অভিযোগ সামনে আসায় বিরোধীরা নতুন করে তৃণমূলকে চাপে ফেলতে শুরু করেছে।


যদিও এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, আগামী দিনে এই ঘটনা ডায়মন্ড হারবার তথা দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।