আজকাল ওয়েবডেস্কঃ দীর্ঘ আট বছরের প্রতীক্ষার অবসান। রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে এবার নিজের ভাঙাচোরা বাড়ি সংস্কারের কাজ শুরু করলেন ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপির মণ্ডল সভাপতি সুভাষচন্দ্র মারিক। ২০১৮ সালে বিজেপি করার 'অপরাধ'-এ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাঁর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও বোমাবাজি চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ। তবে ফলতায় বিজেপি না আসা পর্যন্ত বাড়ি মেরামত না করার প্রতিজ্ঞা নেন তিনি। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই প্রতিজ্ঞা ভেঙে এখন শুরু হয়েছে বাড়ি সংস্কারের কাজ।


ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই সরগরম রাজনৈতিক মহল। পুনর্নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে বিজেপি শিবিরে উচ্ছ্বাস তুঙ্গে। বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের দাবি, দীর্ঘদিনের 'ঘাসফুলের শক্ত ঘাঁটি' বলে পরিচিত ফলতায় এবার পদ্মফুলের উত্থান ঘটতে চলেছে। এই আবহেই নতুন করে চর্চায় উঠে এসেছেন বিজেপির স্থানীয় নেতা তথা মণ্ডল সভাপতি সুভাষচন্দ্র মারিক।


স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৮ সালের ১১ আগস্ট কলকাতায় তৎকালীন বিজেপি সভাপতি তথা বর্তমান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের একটি রাজনৈতিক সভাকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। অভিযোগ, সেই সভায় যোগদান করতে ফলতা থেকে বিজেপি কর্মীদের নিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র মারিক। আর সেই ঘটনার পর থেকেই তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মুখোমুখি হতে হয়।


সুভাষচন্দ্র মারিকের অভিযোগ, সেই সময় ফলতা অঞ্চলে তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর খান ও তাঁর অনুগামীদের রোষের মুখে পড়েন তিনি। রাতের অন্ধকারে তাঁর বাড়িতে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুরের পাশাপাশি বোমাবাজির ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করেন তিনি। একইসঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িও ভাঙচুর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।


স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সেই সময় এলাকায় রাজনৈতিক সংঘাত চরমে পৌঁছেছিল। বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করলেই বিভিন্নভাবে হুমকি, চাপ এবং হামলার মুখে পড়তে হত বিরোধী দলীয় কর্মী-সমর্থকদের। যদিও এই সমস্ত অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে তৎকালীন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। তবে বিজেপির পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ করা হয়েছিল, প্রশাসনের একাংশ নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছিল।


সুভাষচন্দ্র জানান, বাড়িতে হামলার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় তিনি একটি দৃঢ় সংকল্প নেন। তিনি ঠিক করেন, যে বাড়ি রাজনৈতিক হিংসার কারণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, সেই বাড়ি আর মেরামত করবেন না। বরং সেই ভাঙা বাড়িকেই প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে রেখে দেবেন।


মারিক বলেন, “২০১৮ সালে বিজেপি করার অপরাধে আমি জাহাঙ্গীর এবং তাঁর দলবলের রোষের মুখে পড়েছিলাম। আমার বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। বোমাবাজি করা হয়। গাড়ি পর্যন্ত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ নিশ্চুপ ছিল। আমি তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যতদিন না রাজ্যে বিজেপি সরকার আসছে কিংবা ফলতায় পদ্মফুল ফুটছে, ততদিন এই বাড়ি যেমন আছে তেমনই থাকবে।”

তিনি আরও বলেন, “বছরের পর বছর ধরে বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। বৃষ্টি, ঝড়, রোদে বাড়ি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমি আমার প্রতিজ্ঞা ভাঙিনি। আজ দীর্ঘ আট বছর পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে। ফলতায় বিজেপির উত্থান ঘটেছে। তাই এবার কর্মীদের নিয়ে নিজে হাতে বাড়ি সংস্কারের কাজ শুরু করেছি।”

বর্তমানে বাড়ির বিভিন্ন অংশে মেরামতির কাজ চলছে। স্থানীয় বিজেপি কর্মীরাও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে সংস্কারের কাজে হাত লাগিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। কেউ ইট বহন করছেন, কেউ ভাঙা অংশ পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ নির্মাণ সামগ্রী জোগাড় করছেন। ফলে গোটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক প্রতীকী বার্তাও ছড়িয়ে পড়েছে।


বিজেপি কর্মীদের একাংশের বক্তব্য, এটি শুধুমাত্র একটি বাড়ি সংস্কারের ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লড়াই এবং প্রতিরোধের প্রতীক। তাঁদের দাবি, যাঁরা একসময় রাজনৈতিক হিংসার শিকার হয়েছিলেন, আজ তাঁরাই নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।


অন্যদিকে, রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, ফলতার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবহে এই ঘটনাকে সামনে এনে বিজেপি তাদের সংগঠন আরও শক্তিশালী করার বার্তা দিতে চাইছে। বিশেষ করে পুনর্নির্বাচনের আবহে এই ধরনের প্রতীকী ঘটনাগুলি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।


যদিও জাহাঙ্গীর খান বা তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে এই অভিযোগ নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ ঘিরে অতীতেও একাধিকবার শাসক-বিরোধী তরজা তুঙ্গে উঠেছে। ফলে এই ঘটনাও যে আগামী দিনে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।