শ্রেয়সী পাল, মুর্শিদাবাদ:  জিআই ট্যাগ মিলেছে। বিদেশেও রপ্তানি হয়। তবু সরকারি অনীহায় ধুঁকছে মুর্শিদাবাদের মির্জাপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরদ শিল্প। এক সময় যে গ্রামে সাতশোর বেশি তাঁত চলত, আজ সেখানে সচল তাঁতের সংখ্যা মাত্র ৩২০। কারণ, মুনাফা না থাকায় মুখ ফেরাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। তবে রাজ্যে পালাবদলের পর নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন মির্জাপুরের গরদ শিল্পীরা।

গরদ শাড়ি হল মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত সিল্ক শাড়ি। একে ‘গরদ’ বলা হয় কারণ, এটি খাঁটি রেশম সুতোয় বোনা। কোনওরকম জরি বা রঙিন সুতো মেশানো হয় না এতে। সাধারণত সাদা বা অফ-হোয়াইট জমিনের উপর লাল পাড় ও আঁচলে সরু রঙিন সুতোর বর্ডার থাকে শাড়িতে। যদিও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে গরদ সিল্কে এসেছে নতুনত্ব। এখন মেরুন এবং নীল রঙের রেশম সুতো দিয়েও বোনা হচ্ছে গরদ শাড়ি।

ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গে গরদ বোনা শুরু হয় ১৯ শতকের শেষ দিকে। মুর্শিদাবাদ জেলার মির্জাপুর গ্রামে প্রথম এই শাড়ি বোনেন তাঁতি মৃত্যুঞ্জয় সরকার। তখন থেকেই এই শাড়ি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। মির্জাপুরের শশাঙ্কশেখর গম্ভীরা, মনোরঞ্জন পোস্তি, শ্যাম সাহানা ও মনীন্দ্র বীরো গরদ বুননে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পান।

শোনা যায়, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল পদ্মজা নাইডু একসময় শুধু শ্যাম সাহানার বোনা গরদ শাড়ি পড়তেন। এমনকি ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও নিয়মিত মির্জাপুর থেকে গরদ কিনতেন।

এইরকমই ঐতিহ্যবাহী মির্জাপুরের গরদ শাড়ি ২০২৪ সালে জিআই ট্যাগ পায়।  বর্তমানে এই শাড়ি বিদেশে রপ্তানি হয়। তন্তুজ, মঞ্জুষার মতো বড় বড় দোকানেও মির্জাপুরের গরদের চাহিদা রয়েছে। তবু শিল্পীদের অভিযোগ, সরকারি অনুদান বা সহায়তা মেলে না।

শিল্পী পলাশ মুনিয়া বলেন, “জিআই ট্যাগ পাওয়ার পরও আমরা কোনও সরকারি সাহায্য পাই না। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে ভাল রোজগার হয় না। মাসে একজন তাঁতি বড়জোর ১০ হাজার টাকা আয় করেন। এই টাকায় এখন সংসার চলে না। ফলে নতুন প্রজন্ম আর এই পেশায় আসতে চাইছে না। তারা অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন।”
 
গ্রামে প্রায় হাজার ঘর তাঁতির বাস। অথচ সচল তাঁতের সংখ্যা নেমেছে ৩২০তে। কয়েক বছর আগেও যা সাতশোর বেশি ছিল। পলাশবাবুর কথায়, “বিগত সরকার আমাদের তাঁত শিল্পীদের ওপর নজরই দেয়নি। বিশেষ করে গরদ শাড়ির কোনও মার্কেটিং হয় না। প্রচারের অভাবে আমরা বাজার পাচ্ছি না।”