গৌতম রায়: অনেক কিছুই এখন ভার্চুয়াল। যেমন বিজয়া। পয়লা বৈশাখ। প্রিয়জনদের ই-কার্ড পাঠিয়ে দিলেই হল। নো মিষ্টি। নো কুচো গজা। বড় জোর ই-কার্ডে হাঁড়ি ভরা রসগোল্লার ছবি। হয়ে গেল বাঙালির পার্বণ উদযাপন। তবে এত প্রযুক্তির আধুনিকতা, সময়ের দৈন্য, পকেট ফ্রেন্ডলি ব্যাপার-স্যাপার। এসব কিছুকে ওভারকাম করে জামাইষষ্ঠী কিন্তু এখনও খুব একটা ভার্চুয়ালের তালিকায় নিজের নামটা লেখাতে পেরে ওঠেনি শেষ পর্যন্ত।
ষষ্ঠী, এই বিষয়টার সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গের থেকেও বেশি জড়িয়ে আছে সন্তানের মঙ্গলকামনা। বাঙালি হিন্দুর লোকায়ত ধর্মচর্চায় তাই 'ষষ্ঠী'-কে ঘিরে নানা রকম ব্রত আছে। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুষঙ্গের বাইরে সেসব ব্রত মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনের ছবিকেই স্পষ্ট করে তোলে। শীতল ষষ্ঠী, চাপড়া ষষ্ঠী, জামাই ষষ্ঠী ইত্যাদি ব্রতগুলি অতি প্রাচীন মাতৃতান্ত্রিক সমাজের চিহ্ন বহন করছে বলে অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন। কারন, এইসব ব্রত পালনে মেয়েদের ভূমিকাটাই প্রধান। ব্রাহ্মণ্যবাদের কোনও প্রভাব নেই ষষ্ঠী ব্রত পালনের মধ্যে। জাতপাতেরও কোনও বালাই নেই। কেবলমাত্র স্থান ভেদে আচার-উপকরণের পার্থক্য আছে।
এসব আচার বিচার ঘিরে অবশ্য জামাই ষষ্ঠীর জমজমাট আনন্দ খুব একটা প্রভাবিত কোনও দিনই হয় না। জামাইকে সন্তান স্নেহে, 'ষাট ষষ্ঠির ষাট' বলা, এটা শাশুড়িদের কাছে গর্বের বিষয়। তবে এসব লোকাচার ঘিরে যতটা জোগাড়জন্ত, তার থেকে বেশি হইচই পেটপুজো ঘিরে। যদিও এর মধ্যে টুক করে ঢুকে পড়ে গিফ্ট দেওয়া নেওয়ার বিষয়টা।
জামাইষষ্ঠী মানে পঞ্জিকার সেই ছবি, মিষ্টির হাঁড়ি আর আস্ত মাছ নিয়ে গোপাল ভাঁড় মার্কা চেহারার জামাই। এসব আজ একেবারে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেওয়া বিষয়। তবে যতটা আধুনিকতাই আসুক না কেন, সুটেড-বুটেড জামাইকে জিন্স আর টি শার্ট পরা শাশুড়ি বরণ করছে, এমন ছবি এখনও দেখতে পাওয়া যায়নি!
লৌকিক আচার যেভাবে একটা পারস্পরিক মিলনোৎসবের পরিবেশ তৈরি করে এই জামাই ষষ্ঠীকে কেন্দ্র করে তা বাংলার সামাজিক সংস্কৃতির একটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক। প্রতিটি মানুষের জীবনে আনন্দ আছে। বিষাদও আছে। কিন্তু সবকিছুকে আমাদের অতিক্রম করতে হয় বেঁচে থাকার তাগিদে। তাই একটুকরো উৎসব, একটু হাসি, একটু অভিমান - এই নিয়েই চলতে থাকে আমাদের জীবন।















