আত্রেয়ী ভৌমিক 

 

"ধূমজ্যোতিঃসলিলমরুতাং সন্নিপাতঃ ক্ব মেঘঃ সন্দেশার্থাঃ ক্ব পটুকরণৈঃ প্রাণিভিঃ প্রাপণীয়াঃ। ইত্যৌৎসুক্যাদপরিগণয়ন্ গুহ্যকস্তং যযাচে কামার্তা হি প্রকৃতিকৃপণাশ্চেতনাচেতনেষু॥"

( মেঘদূত, পূর্বমেঘ ) 

সেই কোন কালে যক্ষ মেঘকে দায়িত্ব দিয়েছিল বার্তা পৌঁছে দেওয়ার। আজ ২০২৬, এখনও প্রিয় মানুষরা অপেক্ষা করে বসে থাকে কখন মুঠোফোনে এসে পৌঁছবে তার বার্তা। এ যেন আজকের আধুনিক মেঘদূত। তরঙ্গ এসে ধরা দেয় যুগে যুগে। আসুন আমরা দেখে নিই মেঘ চলাচলের পূর্বাপর ইতিহাস। 

 

আনুমানিক চতুর্থ শতকের শেষভাগে মহাকবি কালিদাস আমাদের উপহার দেন 'মেঘদূত'। মন্দাক্রান্তা ছন্দে রচিত এই কাব্য কালিদাসের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় এবং সম্পূর্ণ মৌলিক রচনা। আবার "শুদ্ধ বিরহকে অবলম্বন করে সংস্কৃত সাহিত্যের প্রথম ও পূর্ণাঙ্গ কাব্য(ও) মেঘদূত।" রামগিরি পর্বতে নির্বাসিত এক অভিশপ্ত যক্ষ মেঘকে বার্তাবাহক করে প্রিয়ার কাছে পাঠিয়েছিলেন। সম্ভবত এটিই প্রথম চিঠি হয়ে ধরা দেয় আমাদের কাছে। 

 

মানুষের বিবর্তনের পাশপাশি একই সঙ্গে অগ্রগতি ঘটেছে যোগাযোগ ব্যবস্থার। এই যোগাযোগ কেবল ব্যবসা বাণিজ্যের কারণেই নয়, এই যোগাযোগ মানুষের সঙ্গে মানুষের। কথা বলার ইচ্ছে থেকেই তো ভাষা, লিপি, বর্ণ, আবিষ্কার করেছে মানুষ। মানুষই কেবল আবিষ্কার করেনি, মানুষকেও সময় আবিষ্কার করেছে। সমস্ত কথা মুখে বলে হবে না। সেই তাগিদে এল লেখা। সমস্ত লেখা তো সকলের জন্য নয়, সেই তাগিদে এল চিঠি। এই চিঠির ইতিহাস আমাদের একটু জানা দরকার। 

 

আনুমানিক ৩০০০ বছর আগে পায়রাকে দূত করে চিঠি পাঠানো হত। পায়রার পায়ে চিরকুট বেঁধে দেওয়া হত। যদিও এই চিঠি ছিল একমুখী। পায়রা সঠিক স্থানে না গেলে চিঠিও হারিয়ে যেত। জমা ছিল অনিশ্চয়তা আর উত্তেজনা। 

 

১৮৫৪ সাল থেকে ভারতে ডাক ব্যবস্থা চালু হয়। গড়ে ওঠে পোস্ট অফিস। চিঠি বয়ে নিয়ে আসতেন ডাকপিয়ন। এই প্রথম সাধারণ মানুষ চিঠি লিখতে পারল। ব্যক্তিগত চিঠি লেখা শুরু হল। হাতের লেখা, কালির গন্ধ, খাম খোলার শব্দ মানুষকে মুগ্ধ করে রেখেছিল। জমিয়ে রাখা হত সেই সব চিঠি। একটা ডাকটিকিট, একজন ডাকপিয়ন, হাজারও শব্দের অপেক্ষা মানুষকে নতুন দিগন্ত খুলে দিল। 

 

১৮৫০ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত জরুরি বার্তা প্রেরণের মাধ্যম ছিল টেলিগ্রাম। মূলত মোর্স কোডে জরুরি বার্তা পাঠানো হত। শব্দ প্রতি পয়সা ধার্য করা হত। টেলিগ্রাম অধিকাংশ সময় দুঃসংবাদ বয়ে আনত। 

 

১৯৮০- ২০০০, এই সময়ের যুগান্তকারী প্রসার হল আধুনিক টেলিফোনিক ব্যবস্থা ও সম্ভাবনার। বাংলা তর্জমা করলে যার মানে দাঁড়ায় দূরভাষ। দূর থেকে ভেসে আসা গলার আওয়াজ শীতল বাতাস বইয়ে দিতে পারত। বহুদিন দেখা না হলেও একবার গলা শোনা যেত প্রিয় মানুষের। 

 

১৯৯০-২০১০ আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা হল আরও দ্রুত। মুঠোফোন এল। সেই সাথে এল 'এসএমস'। শর্ট ম্যাসাজিং সার্ভিস। কমে এল চিঠির ফর্মালিটি। কয়েক সেকেন্ড, কয়েক মিনিটের মধ্যে মানুষ মানুষের মনের কথা লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছে নিজের মানুষকে, বন্ধুকে, বাবাকে, মাকে। একবারে টাইপ করা যেত ১৬০ খানা অক্ষর। কম্পিউটার থাকলে লেখা যেত লম্বা মেল। কাজের চিঠি হারিয়ে যাওয়ার ভয় এল কমে। চিঠির ফর্মালিটি এল কমে। 

 

২০০৯ থেকে এখনও পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ যোগাযোগ মাধ্যম হল হোয়াটসঅ্যাপ। ইন্টারনেটে এবার আর শুধু লেখা নয়, পাঠানো যাচ্ছে গলার আওয়াজ, তৎক্ষণাৎ ছবি, ভিডিও, স্টিকার। উহুঁ, শুধু কথা বা গলার আওয়াজ নয়, ভিডিও কলে সরাসরি পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে মানুষটির ঘরে। এই ধরুন এই মুহূর্তে আপনি চাকরি করছেন সিডনিতে। আপনার বাবা মা গড়িয়ায়। একটা ভিডিও কল মুহূর্তে জুড়ে দেবে সিডনি আর গড়িয়াকে। মুহূর্তে চোখে চোখ পড়বে সদ্য প্রেমে পড়া যুবক যুবতীর। মুহূর্তে রাগ ভেঙে যাবে, অভিমান মুছে যাবে। দূরের মানুষকে আর দূর বলে মনে হল না। সে যেন পাশের ঘরেই আছে। 

 

চিঠি থেকে হোয়াটসঅ্যাপের এই বিশাল জার্নি আমাদের গতি আর স্বভাবকে পাল্টে দিয়েছে। চিঠির সময়টা ছিল অপেক্ষার। কাগজ, কালি, ভাঁজ করা নাম লেখা খাম, পোস্টম্যানের বেল, লেখার সময় ভাবতে হত এক আকাশ। একবার লিখে ফেললে মোছা যাবে না। চিঠি রেখে দেওয়া যেত বছরের পর বছর। চিঠি আসার সময়টুকু কেটে যেত উৎকণ্ঠায়। ওই দেরির মধ্যেই ছিল যত্ন আর গুরুত্ব। 

 

চিঠি যদি হয় একটা ঘটনা, হোয়াটসঅ্যাপ তবে অভ্যেস। গতি বাড়লেও ওজন কমেছে। মাসে একটা চিঠি পেলে সেই চিঠিকেই কত-কত বার পড়ত মানুষ। এখন আনলিমিটেড মেসেজের ভিড়ে আমরা সমস্ত কিছু দশ সেকেন্ডে ভুলে যাই। বুকের মধ্যে একটা ভয় সেই প্রাচীনকাল থেকে বাসা বেঁধে থাকে। যদি ঠিকানা বদলে যায়? এখনও সেই ভয় দূর হয়নি। যদি বদলে যায় ফোন নম্বর? 

 

সব যদি বদলে যায়,আমি যদি যক্ষ হই, মেঘ রাজি হবে তো?