শ্যামলী ভট্টাচার্য
মা সারদা দেবীর সামাজিক অবদান কোনও প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলন ছিল না, ছিল জীবন দিয়েই সমাজকে নতুন পথ দেখানো। শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবকে তিনি সমাজের মাটিতে প্রয়োগ করেছিলেন। তৎকালীন রক্ষণশীল বাঙালি সমাজে জাতিভেদ ছিল অত্যন্ত কঠোর। মা সারদা সেই প্রাচীর ভেঙে দিয়েছিলেন। মা সারদা বলতেন, "আমার ছেলে যদি ধুলো কাদা মাখে, আমাকেই তো ধুলো ঝেড়ে কোলে নিতে হবে।" এই আদর্শে তিনি সবার জন্য মা হয়ে উঠেছিলেন।
ডাকাত আমজাদ, মুসলমান মজুর, চন্ডাল, মেথর - যাঁদের তথাকথিত ভদ্রসমাজ ঘৃণা করত, মা তাঁদের নিজে হাতে খেতে দিয়েছেন, তাঁদের এঁটো পর্যন্ত পরিষ্কার করেছেন। একবার ভক্তরা আপত্তি করলে তিনি বলেছিলেন, "আমজাদও আমার ছেলে। শরৎ যেমন আমার ছেলে, আমজাদও তেমনই।" এটি ছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষে দাঁড়িয়ে এক বৈপ্লবিক সামাজিক সাম্যের বার্তা। মা নিজে প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু নারী শিক্ষার প্রবল সমর্থক ছিলেন।
তিনি নিজে গ্রাম্য লজ্জা ও পর্দার মধ্যে থেকেও প্রয়োজনে তা ত্যাগ করেছেন। ভক্তদের সামনে এসেছেন, কথা বলেছেন, যা সেই যুগে এক বিধবা ব্রাহ্মণ নারীর পক্ষে অকল্পনীয় ছিল। ভগিনী নিবেদিতার বালিকা বিদ্যালয়কে তিনি আশীর্বাদ করেন এবং বলেন; মেয়েদের লেখাপড়া শেখা দরকার। তিনি সরলা দেবী, গৌরী-মা এঁদের শিক্ষা বিস্তারের কাজে উৎসাহ দিতেন। তখন হিন্দু বিধবার জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টের। মা বহু বাল্যবিধবাকে শিষ্যা করে তাঁদের আধ্যাত্মিক ও স্বাবলম্বী জীবনের পথ দেখান। তিনি কখনও বৈধব্যের কঠোর নিয়ম তাঁদের উপর চাপিয়ে দেননি। মানবসেবাই ধর্ম -- এটাই ছিল তাঁর কথা। মা সারদা বলতেন, "জগৎকে আপনার করে নিতে শেখ। কেউ পর নয়, জগৎ তোমার।"
জয়রামবাটিতে দুর্ভিক্ষের সময় তিনি নিজের সামান্য সম্বল থেকেও মানুষকে সাহায্য করেছেন। তাঁর বাড়ি ছিল সকলের জন্য অবারিত দ্বার। পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের যে সেবামূলক কাজ - হাসপাতাল, স্কুল, ত্রাণকার্য - তার আধ্যাত্মিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন মা-ই। স্বামী বিবেকানন্দ মায়ের অনুমতি নিয়েই এই সেবা যজ্ঞ শুরু করেন।
মা, উপদেশ দিতেন না, জীবন দিয়ে শেখাতেন। তিনি নিজে সংসারের সমস্ত কাজ - ধান ভানা, রান্না করা, বাসন মাজা - অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করতেন এবং শেখাতেন, সংসারকেও পুজোর মতো করে আপন করতে হয়।
মা সারদা কোনও বক্তৃতা দেননি, বই লেখেননি, কিন্তু তাঁর মাতৃত্বের শক্তি দিয়ে তিনি বাঙালি সমাজের সবচেয়ে গোঁড়া দু'টি জায়গায় আঘাত করেছিলেন - জাতিভেদ এবং নারীর প্রতি অবহেলা। তাই তিনি শুধু শ্রীরামকৃষ্ণ-পত্নী নন, তিনি আধুনিক ভারতের প্রথম সারির একজন সমাজ সংস্কারক। গণ্ডিভাঙা মা সারদা - এই কথাটার মধ্যেই তাঁর আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে।
যে যুগে একজন বাঙালি ব্রাহ্মণ বিধবার জীবন চার দেওয়ালের মধ্যে বাঁধা ছিল, আচার, বিচার, জাত-পাত, ছোঁয়াছুঁয়ির বেড়াজালে ঘেরা ছিল, সেই যুগে দাঁড়িয়ে মা সারদা এক এক করে সব গণ্ডি ভেঙে দিয়েছিলেন। তিনি কোনও শ্লোগান দেননি, তিনি শুধু মা হয়ে বেঁচেছিলেন, আর সেই মাতৃত্বই সব গণ্ডি ভেঙে দিয়েছিল।
জাতের গণ্ডি ভাঙা--এটা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় বিপ্লব। তখনকার দিনে ব্রাহ্মণ বাড়িতে নীচু জাতের ছায়া পড়লে গঙ্গাজল ছেটাতে হত, আর মা কী করলেন? ডাকাত সর্দার আমজাদকে নিজের ছেলে বললেন। আমজাদ ধর্মে মুসলমান, ডাকাত সে। তাইই সমাজের চোখে একেবারে অপাঙক্তেয়। মা তাঁকে নিজে হাতে ভাত বেড়ে খাওয়ালেন, খাওয়া শেষে তাঁর এঁটো পাত নিজে পরিষ্কার করলেন। ভক্তদের কেউ কেউ আপত্তি করলে বললেন, "আমার শরৎ যেমন ছেলে, ওই আমজাদও তেমন ছেলে।" চন্ডাল, মেথর, বাগদি-যারা সমাজে অস্পৃশ্য, তারা এলে, মা তাদের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতেন। তিনি প্রমাণ করলেন, রক্তের সম্পর্কের চেয়ে মাতৃত্বের সম্পর্ক বড়, আর মাতৃত্বে কোনও জাত নেই।
মা ছিলেন হিন্দু ব্রাহ্মণ ঘরের বিধবা, কিন্তু তাঁর কাছে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান সব সমান। তিনি বলতেন, "ঠাকুরের কাছে তো সবাই আসত - হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান। আমার কাছেও সবাই আসবে।" তাঁর মুসলমান ছেলেরা এলে তিনি তাঁদের জন্য আলাদা হুঁকো রাখতে দেননি। একই হুঁকোয় সবাই খাবে, এটাই ছিল তাঁর নিয়ম। ধর্মের গোঁড়ামি ভেঙে তিনি দেখালেন - সব ধর্মের মানুষই এক মায়ের সন্তান।
উনবিংশ শতাব্দীতে এক বিধবার কী করার অধিকার ছিল? সাদা থান, নিরামিষ, একবেলা আহার, আর ঈশ্বরের নাম।
মা সেই গন্ডিও ভাঙলেন। ঠাকুর চলে যাওয়ার পর তিনি শুধু কাঁদেননি, হাতের বালা খোলেননি। বৈধব্যের জড়তা তিনি মানেননি। তিনি পর্দা ভেঙে ভক্তদের সঙ্গে কথা বলেছেন, দীক্ষা দিয়েছেন, সঙ্ঘ পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছেন। যে কাজ শুধু পুরুষ গুরুদের করবার তখন প্রথা ছিল, সেই গণ্ডি তিনিই প্রথম ভাঙলেন। মেয়েদের তিনি লেখাপড়া শিখতে বলতেন। ভগিনী নিবেদিতাকে ডেকে বলেছিলেন, "মেয়েদের জন্য স্কুল করো, আমি আশীর্বাদ করছি।"
মা আচার মানতেন, কিন্তু আচারকে কখনও মানুষের চেয়ে বড় করেননি। তিনি বলতেন, "আচারের চেয়ে বিচার বড়।"
কেউ ছোঁয়া লেগে গেলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হত, আর মা বলতেন, "মানুষ তো ভগবানকে ডেকেই পবিত্র হয়, তাকে আবার অপবিত্র কী করবে?" এই জন্যই তাঁকে গণ্ডিভাঙা মা বলা হয়। তিনি শাস্ত্র দিয়ে সমাজকে বিচার করেননি, মাতৃহৃদয় দিয়ে শাস্ত্রকে বিচার করেছেন। শেষে একটাই কথা-ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এসেছিলেন সমস্ত মতকে এক করতে, আর মা সারদা এসেছিলেন; সমস্ত মানুষকে এক করতে। ঠাকুর ভাঙলেন ধর্মের গণ্ডি, মা ভাঙলেন সমাজের গণ্ডি।
















