সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়
থানা: বৌবাজার, ডাকঘর: প্রিন্সেপ স্ট্রিট, কলকেতা --৭০০০৭২।
চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের বিরাট এলআইসি বিল্ডিংয়ের ঠিক পিছনে একটা রাস্তা আছে। প্রস্থে দশাসই, কিন্তু দৈর্ঘ্যে অপুষ্টির ছাপ প্রকট। দর্জির ফিতেয় টেনেটুনে বড়জোর তিনশো -সাড়ে তিনশো মিটার। সোজা গেলেই চাঁদনিচক বাজার। সাব্বির হোটেলের রেজালাঘরের উল্টোদিক দিয়ে ঢুকলে, যতদূর চাঁপ রেজালার খোশবাই, ততদূরই গলি। তারপর শুরু হবে টেম্পল স্ট্রিট।
"গুমঘর" কথাটা প্রথম শুনি ছোটবেলায় দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' পড়তে গিয়ে। কী যে গা ছমছমে শব্দবন্ধ! মনে হয়েছিল-মমি যদি কোথাও থাকে, তা এইখানে, এইখানে! হঠাৎ একটা গলিতে ঢুকে দেখি লেখা - 'গুমঘর লেন'! সে যে কী অপার বিস্ময়, কী বলব! তারপর থেকে, শুধুমাত্র ওই রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার লোভে, একটু ঘুরপথ হলেও, পেটুক বাঙাল সাব্বিরে যাওয়ার আগে "গুম হয়ে যেত"! তথ্য ইত্যাদি পেলাম অনেক প'রে। ততদিনে রাস্তা আরও সরু হয়েছে...বেড়েছে পশরা। তবু...মনের গুমঘর সেরকমই রয়েছে। আজ তার একটি দরজা খুলে দিলাম সব্বার কাছে।
গুমঘর লেন।
খুবই ভীতিপ্রদ শব্দ। কাউকে খুন করে তার মৃতদেহ যে ঘরে লুকিয়ে রাখা হয় - জমিদারবাড়িতে তো হতই...এখনও তো আকচার হচ্ছে মশাই - তাকেই বলা হয় "গুমঘর"! না - না, অত ভয়ানক ঘটনা এখানে ঘটেনি। রাস্তাটি কিন্তু বহু পুরনো। ১৮৫০ সালের Bengal Agra Directory-তে এর নাম পাওয়া যায়। কেন এরকম, যাকে বলে - ক্যাডাভেরাস নাম? শ্রী জহরলাল ধর মশাইয়ের ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত "সচিত্র কলিকাতা রহস্য" আর Mr. P.T.Nair-এর লেখা থেকে জানা যায়, সেই সত্যযুগে এখানে ছিল 'খোট্টা'-দের বিরাট বস্তি আর একটি দেশি হাসপাতাল -- মেয়াদি বুখার আর সংক্রামক রোগের একমাত্র হাসপাতাল। ছোঁয়াচে অসুখ যাতে না ছড়ায়, তাই রোগীরা কোয়ারেন্টাইনে থাকতেন আলাদা আলাদা ঘরে। কেউ বড় একটা ঢুকতোও না সেখানে।
হাসপাতালটা প্রথমে ১৭৯৬ সালে স্থাপিত হয় চিৎপুরে। কিন্তু জনবহুল স্থান থেকে সরিয়ে আনা হয় এইখানে। আবার ১৮৭৪ সালে চলে যায় স্ট্রান্ড রোডে। তখন এটার নাম হয় "মেয়ো নেটিভ হসপিটাল"।
এই হাসপাতালের কথা একটু শুনবেন নাকি শ্রীপান্থ-র থেকে? মানে নিখিল সরকার থেকে, তিনি লিখছেন, "অষ্টাদশ শতকের কলকাতা তখন সাক্ষাৎ যমপুরী। লোক আসে আর মরে। মরে, তবুও আসে। দিব্যি সুস্থ-সমর্থ জোয়ান ছেলে সন্ধ্যায় নেমেছে চাঁদপাল ঘাটে। রাত্তিরটাও কাটল না। ভোরবেলাতেই দেখা গেল কলকাতার অ্যাডভেঞ্চারে দাঁড়ি পড়ে গেছে তার। লোক মরত। এখনও মরে, তখনও মরত। সাহেব-নেটিভ নির্বিশেষেই মরত। অষ্টাদশ শতকের কলকাতায়, বিশেষ করে ব্ল্যাক টাউনেও চিকিৎসা বলতে তেমন কিছু ছিল না। অথবা ছিল কবরেজি, হেকিমি, ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবচ। ঠাকুর যেমন, নৈবেদ্যও তেমনই, ওষুধ বলতে দৈব বা স্বপ্নাদ্য, ভালুকের লোম, সাপের চোখ, ধনঞ্জয় পাখির ঠোঁট। এ সব নিয়ে কালো চামড়ার সমস্যা থাকুক আর না-ই থাকুক, সমালোচনায়-সমস্যায় পড়লেন তাঁদের সাদা মালিকরা। নেটিভ যদি মরে, খিদমত খাটবে কে? অবশ্য সহৃদয়তার দিকটাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভাল-মন্দ সমাজে দুই থাকে। তাই প্রস্তাব উঠল ১৭৯২ সালে-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতীয় কর্মীদের জন্য হাসপাতাল তৈরি হোক, আলাদাভাবে। এক টেবিলে যেমন সাদা আর কালো চামড়া বসে না, রেলের এক কোচে চড়ে না, তেমনই একই হাসপাতালের বিছানাতেই বা শুয়ে থাকে কেমনে? তা নিয়েও চলল বিস্তর জলঘোলা। না হলে কলুটোলায় হাসপাতাল তুলতে আরও বছর দুই লাগে? দেখা গেল, এর পরের বছরগুলোয় এক ঠিকানা থেকে অন্য ঠিকানায় হারিয়ে যাওয়া, গুম হয়ে যাওয়াই নেটিভ হসপিটাল-এর নিয়তি। কারণ স্বাস্থ্যসম্মত খোলামেলা জায়গার অভাব। তাই কলুটোলায় চার বছর চিকিৎসা চলার পর ১৭৯৬ সালে হাসপাতাল উঠে এল ধর্মতলায়। এখনকার হিসেবে বললে চাঁদনি চকে।"
আর এই সময়েই শহর পেল তার গুমঘর গলি। সেই সময়ে যে বাড়িতে চলত হাসপাতালের কাজকর্ম, তার উত্তর দিকেই ছিল এই গলি। বলা হয়, এই গলির এক বাড়িতেই না কি আলাদা করে রাখা হত ছোঁয়াচে অসুখের রোগীদের। সেই পুরোনো দিনে, প্রায় Solitary Confinement-এ কত হতভাগ্য রোগী যে প্রায় বিনা চিকিৎসায় ওই ঘরগুলিতে মরে পড়ে থাকতো - -হয়তো খোঁজ পড়ত বহু দেরিতে -- কোনও সরকারি খাতাতেও বোধহয় লেখা নেই! এওতো গুমঘরেরই নামান্তর। তাই মানুষের মুখে মুখে হয়েছিল রাস্তার এই অমোঘ নামকরণ। যতদূর জানা যায়, গলির সাত নম্বর বাড়িটি ছিল গুমঘর ওয়ার্ড। একটানা ৭৮ বছর ধরে গুমঘর লেন-এ চলেছিল ছোঁয়াচে অসুখের চিকিৎসা। শেষের প্রায় পনেরো বছর নেটিভ হাসপাতালের সর্বেসর্বা ছিলেন সার্জন-মেজর এন সি ম্যাকনামারা।
"একটা টুকরো খবর মেলে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল গেজেট-এর ১৯১৯ সালের মে মাসের সংখ্যায়। সেই খবর জানিয়ে দিয়েছে, শুধু ঠিকানাই নয়, ধর্মতলার পর নেটিভ হাসপাতালের নামটাও বদলিয়েছে, হয়েছে মেয়ো নেটিভ হসপিটাল। ধর্মতলা থেকে সে গিয়েছে গঙ্গার ঘাটে, স্ট্রান্ড রোডে। সেই ডাক্তার ম্যাকনামারা ধর্মতলার কিছু মানুষ এবং উপরতলার অফিসারদের আপত্তি সত্ত্বেও, এক সকালে ম্যাকিনটশ বার্নের দলবল নিয়ে হাজির হলেন গঙ্গার ঘাটে। আবর্জনা সরিয়ে বের করে নিলেন হাসপাতাল স্থানান্তরিত করার জমি। ১৮৭৩-এ লর্ড নর্থব্রুক প্রথম ইটখানা গেঁথেও দিলেন জমিতে, চলতে থাকল টাকা তোলার কাজ। একা মেয়ো মেমোরিয়াল কমিটি-ই দিল ৫০,০০০ টাকা; শর্ত এই হাসপাতালের নামের আগে মেয়ো জুড়তে হবে। বছর কুড়ি পরে একদিন বন্ধ হয়ে গেল স্ট্রান্ড রোডের সেই হাসপাতালও। "(পুরনো কলকাতার রাস্তা -- সমীর রায়চৌধুরী)
থেকে গেল শুধু গুমঘর লেন। পুরসভার গেজেটে, বেঙ্গল আগ্রা ডিরেক্টরিতে আর শহরবাসীর মুখে।
এখন গুমঘর লেন ব্যবসাকেন্দ্র। কী নেই সেখানে, আলপিন টু এলিফ্যান্ট! জানেন তো, এক নম্বর গুমঘর লেন এখন Bengal Security Agency নামের একটি সংস্থার আপিস। গুমঘরের দ্বার রক্ষা করছে যেন প্রহরীর দল। বর্তমানে বাড়িটা দেখলে মনে হবে যেন 'আবোল তাবোলের' বুড়ির বাড়ি, এই বুঝি পড়ল ভেঙে! তার মধ্যেই নানা কারবার... চলছে কিন্তু পড়ছে না। এটিই সেই স্মৃতির হাসপাতাল.. বিস্মৃতির গুমঘর। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, এরপরও কলকেতার প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে না?
গুমঘর লেন নামটির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটান মহঃ খাঞ্জা খান সাহেব। খানসাহেবের মুলুক কাবুল। 'রহন -ঠেক' পাঁচ নম্বর গুমঘর লেন, খান কোঠি; হিং, পেস্তা, কাঠবাদাম, মনাক্কা আর টাকা ধার দেওয়ার ব্যবসা করতেন।
ছিলেন আমাদের হাসপাতাল আউটডোরের 'ক্রনিক ক্লায়েন্ট'। শুধু নিজেই আসতেন না, গাদাগুচ্ছের ভাই - ভাতিজা - বেরাদরের, যাকে বলে, Mental to Dental (এবং বহুক্ষেত্রে সেগুলি বিনিসুতোর মালায় গাঁথা) সমস্যার সমাধানের সু-ব্রত নিয়ে আসতেন। সেই রকম এক গন্ধবিচার প্রকল্পনার কথা বলি। নাক সিঁটকোবেন না, প্লিজ! গুমঘর লেনের সেই কাবুলিওয়ালা বাঁধিয়ে বসেছিল Intestinal Obstruction -- অন্ত্রের অন্তর্দ্বন্দও বলতে পারেন সোজাকথায়। অপারেশন ভালভাবে হলেও..."পরেশানি" শুরু হল তারপরে! কিছুতেই আর সেই 'খাজা খাসতো খাঁ'-র ( ওই রকমই নাম ছিল তার) মেজাজ কিংবা Bowel কোনওটাই খাস্তা হচ্ছিল না। আর আমাদের চিন্তা ক্রমশ দুম্বাকৃতি ধারণ করছিল! কিচ্ছুটি "নড়চড়" না হওয়ায় স্থির করা হলো CT Scan করানো হবে। তখন কলকাতা ছিল এক্কেরে গ্রামীণ... লেন-বাইলেনে সিটি ছিল না। তাই সরকারি রোগীবাহনে খাঁ-সাহেবকে পাঠানো হলো মধ্য কলকাতায় সবেধন Scan মণির ক্লিনিকে।
মৌলালি - এস এন ব্যানার্জি রোডের চৌমহনীতে সে যুগে ছিল এক ভুবন বিখ্যাত কচুরির দোকান -- শিয়ালদহ স্টেশন পর্যন্ত সুবাতাস তার জানান দিত। অ্যাম্বুল্যান্স মৌলালি পৌছেছে কী, পৌছোয়নি -- হিংয়ের ময়ানের কচুরি ছাড়া হয়েছে কড়াই ভর্তি ডালডায় --খাঁ-সাহেবের চিত্তচাঞ্চল্য উপস্থিত হল! মিঁয়া কি টোড়ি - এক্কেবারে যেন দ্রুত ঝালা গৎ! এমনই কপাল, ট্র্যাফিক জ্যামও তখনই যেন ঝেঁপে এল। কাবুলিওয়ালার রাগ-প্রধান কন্ঠের আর্তি গাড়ি ঘুরিয়ে দিয়েছিল। নীলরতন হাসপাতালে গিয়ে তিনি নিজে যত না বেঁচেছিলেন, আমাদের বাঁচিয়েছিলেন অনেকগুণ বেশি। আমি নিশ্চিত, সুখী কাবুলীওয়ালাদের ডেরায় হিং-য়ের গন্ধ নিশ্চয়ই বন্ধুর মতো জড়িয়ে থাকে। থাকেই। সে তিনি যতই গুমঘর নামের কোমর্বিড লেনে থাকুন না কেন।
















