গৌতম রায়
সময় সারণিতে ভর করে এক একটা কালচক্র ।সেই কালচক্রের উপর নির্ভর করে ইতিহাস রচিত হয়। পুরনো ইতিহাসের কালগর্ভের ভেতর ধ্বনিত- প্রতিধ্বনিত হতে থাকে নতুনের আহ্বান। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, চির নূতনের ডাক।
সেই চির নূতনের ডাক দিয়ে চলাই হল জীবনের ধর্ম ।নতুন কে যদি আমরা হৃদয়ের অন্তস্থল দিয়ে গ্রহণ করতে না পারি , তবে পুরাতনের জীর্ণ আবর্তে আমরা নিজেদের আকীর্ণ করে ফেলব ।সেই আকীর্ণতার মধ্যে দিয়ে ইতিহাসের দিকচক্রে নতুন কিছু রচনার উপক্রম আমাদের থাকবে না।
তাই চিরনূতনকে ডাক দেওয়াই হল চিরনবীনের জীবনের বিশেষ ধর্ম। শঙ্খ ঘোষের ভাষায় যাকে বলা যায় ; শূন্যতাকে ভরিয়ে দেওয়া। সেই শূন্যতাকে ভরিয়ে দেওয়ার ধর্মের যাপন ই হল, জীবনের কথা। যে কথার ভাব মূর্ছনায় হালকা উৎসারিত হবে না ।জীবন মানে যে জরি, সেই জরির রূপকথায় রচিত হবে জীবনের বারোমাস্যা।
সমরেশ বসু যেমন তাঁর ,'টানাপোড়েন' উপন্যাসের ভেতর দিয়ে বিষ্ণুপুরের বালুচরীর ইতিহাস লিখতে গিয়ে ইতিহাস- লোক পুরান ,লোককাহিনী ,জীবন যুদ্ধ , আর বেঁচে থাকবার প্রতি অন্তহীন জাগরকে, এক অনবদ্য রূপকথার আঙ্গিকে খোদাই করেছিলেন ।ঠিক সেভাবেই যেন আমাদের জীবনের প্রতিটি পর্বের , প্রতিটি আঙ্গিকের রূপরেখা কে, আমরা মেলে ধরতে চাই।
যাঁর হাতে আছে কলম, সে কাগজে-কলমে তা ফুটিয়ে তোলে। যাঁর হাতে আছে তুলি ।সে ফুটিয়ে তোলে ক্যানভাসে ।আবার যাঁর হাতে আছে তাঁতের জমিন ।সে ফুটিয়ে তোলে শাড়ির নকশায়।
কিন্তু যেভাবেই হোক আমরা ফুটিয়ে তুলতে চাই ।কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যেমন অনাগত বসন্তের উদ্দেশ্য ফুল ফোটানোর কল্পনায় তাঁর কাব্যের দুনিয়াকে প্রসারিত করেছিলেন- সেভাবেই আমরা , আমাদের চিন্তার, ভাবনার, মননের প্রত্যেকটি স্তরকে প্রসারিত করতে চাই।
শিল্পের প্রতি শিল্পীর অন্তহীন জাগরও এভাবেই উদ্ভাসিত হয় ।তাই যাপনচিত্রের চরম হতাশাতেও জীবনানন্দ ছাড়তে পারেন না কবিতা লেখাকে ।চরম অর্থকষ্ট ।ধার দেনা। নানা ধরনের সামাজিক বিপর্যয়ের জেরে ব্যক্তি জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ী আবার বুক বাঁধেন নতুন থিয়েটার করবার জন্য। জীবনের সমস্ত রকমের শোক - বিপর্যয়- যন্ত্রণাকে অতিক্রম করেও রবীন্দ্রনাথ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করতে পারেন না , তাঁর সৃষ্টির স্রোতস্বিনী ধারা কে।
স্রষ্টার এই চরৈবতি ধারাকে আশ্রয় করেই তো আমাদের মত সাধারন পাঠক কুলের বেঁচে থাকা ।দর্শক কুলের বেঁচে থাকা। আমাদের বাঁচার প্রতিটি রসদ জোগান দিতে গিয়েই স্রষ্টারা, তাঁদের জীবনের সমস্ত রস নিঙরে দিয়েও, একটি বারের জন্য নিজেদেরকে রিক্ত ,দেউলিয়া বলে ঘোষণা করেন না ।
তাই জীবন সায়হ্নে রবীন্দ্রনাথ খুব মজা করে বলতেন ; তাঁর ঝুকে বসে লেখবার অভ্যাস সম্পর্কে-- কলসি যে শূন্য হয়ে আসছে ।আর কোনও অবস্থাতেই রস নির্গত হয় না--















