সুশীল সাহা

কথাকার ভবানী ঘটকের লেখার সঙ্গে আমার অল্পবিস্তর পূর্ব পরিচয় আছে। সীমান্ত শহর বনগাঁর অধিবাসী হয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন শিকড়হীন বহু মানুষকে। এ ছাড়া পারিবারিক বাতাবরণে পেয়েছেন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের রাজনৈতিক দীক্ষা। তাই তাঁর লেখার জগত জুড়ে নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কথা এবং তাঁদের জীবন, জীবিকার কথা, বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কথা সাবলীলভাবে উঠে আসে। তাঁর এই অবলোকন নিরাপদ দুরত্ব থেকে নয়, বরং খুব কাছের সেই দেখা। মানুষের ভিতরকার লোভ লালসা, মোহ ও মাৎসর্যের টানাপোড়েন এবং একের সঙ্গে অন্যের সম্পর্ক নিয়ে নানান কূটতর্কের অবতারণা আছে তাঁর লেখায়। তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘দখলদার’-এ উঠে এসেছে একদিকে নগরায়নের পালাবদল এবং অন্যদিকে মানুষে মানুষে নানা সংঘাত ও সংঘর্ষের কথা।

গোটা উপন্যাসটি ‘নীলু’র বয়ানে বিদ্ধৃত হলেও এটি আসলে পাঁচ বন্ধুর কথা। তবে শেষ পর্যন্ত উপন্যাসটি ওই বন্ধুবৃত্তের ‘সৌমেন’ নামের এক শিকড়হীন উদবাস্তুর ‘চলতি হাওয়ার পন্থী’ হয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াই ও নাগরিক উন্নয়নের ডামাডোলে গণ্যমান্য  সামাজিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার কাহিনি বিবৃত করে। সেই হয়ে ওঠার বৃত্তান্তে আছে অনেক নীতিহীনতা ও সার্বিকভাবে এক সুযোগসন্ধানী লড়াই। সেই লড়াইয়ের নানা অলিগলি আমাদের সবার খুব চেনা নয়। দূরতর দ্বীপের মতো তার অবস্থান। আমরা কেবল সেসব দূর থেকেই দেখি। সেই গোলকধাঁধার মধ্যে সকলের প্রবেশাধিকার নেই। সৌমেনের মতো সত্যিকারের সুযোগসন্ধানী মানুষ সময়ের দাবি মিটিয়ে একজন স্বতন্ত্র সামাজিক চরিত্র অর্জনের যোগ্য হয়ে ওঠে। এই উপন্যাসের কথক নীলুর বয়ানে সৌমেনের সেই উত্থানকাহিনি বিবৃত । তবে সেই উত্থানকাহিনির পটভূমি হিসেবে কলকাতা সন্নিহিত নতুন রাজারহাট-নিউনিউনের নগরায়নের ইতিকথা এবং সেই সূত্রে বিরাট এক জনগোষ্ঠির উচ্ছেদ কাহিনিও এই উপন্যাসের সঙ্গে লেপ্টে আছে।

উপন্যাসের শুরুটা কোনও এক দোলের দিনের রঙ খেলার আখ্যান দিয়ে। প্রতি বছর পাঁচ বন্ধুর বাড়িতে ঘুরে ফিরে এই আয়োজন হয়। সেবার ছিল নীলুর বাড়িতে। সেদিন নীলুর স্ত্রীকে রঙ দেওয়ার ছলে সৌমেন এক মাত্রাতিরিক্ত অসভ্যতা করেছে, এমনটাই নীলু জানতে পারে রাতে শোবার বিছানায়। নীলুর স্ত্রী নীপা তাঁর ব্লাউজ খুলে দেখায় দুই হাতের কয়েকটা আঙ্গুলের ছাপ। সৌমেনের এই অপকর্মে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয় নীলু। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের ফাটল ধরে এইভাবে। তারপর সারা উপন্যাস জুড়ে প্রতিশোধস্পৃহ নীলুর নানান পরিকল্পনার বয়ান আমরা জানতে পারি নীলুরই বয়ানে। শেষ পর্যন্ত তেমন কিছুই হয় না। সাধারণ পাঠকের ইচ্ছাপূরণ করেন না লেখক। কেবল নীলুর বাড়িতে অন্য এক আয়োজনে নীপা ইচ্ছে করেই সৌমেনের গায়ে গরম চা ঢেলে দেয়। সেই ঘটনার সূত্র ধরে আর তেমন কিছুই ঘটে না। প্রশ্ন জাগে দোলের রঙ খেলার পরেও অত সময় ধরে সৌমেনের ওই অপকর্মের চিহ্নটি নীপা রেখে দিয়েছিল কেন? সাধারণত রঙ খেলার পরে ভালভাবে স্নান করাই রীতি। আর সৌমেনকে দেখানোই যদি তাঁর একমাত্র অভিপ্রায় হয় তাহলে তো অনেক আগেই সেটা ও করে ফেলতে পারত। রাতের শোবার বিছানায় নীলুর অন্তরঙ্গ হবার সময়ে অনিচ্ছুক নীপার এই পর্দাফাঁস আর যাই হোক, একটু বিসদৃশ লাগে। তবু উপন্যাসের গতিপ্রবাহের খাতিরে আমরা ব্যাপারটা মেনে নিই এবং অপেক্ষা করতে থাকি নীলুর পরবর্তী পদক্ষেপের। 

এরপর উপন্যাসের গতিমুখ একটু একটু করে পাল্টাতে থাকে। কলকাতার এক নতুন শহর হিসেবে নিউটাউন তথা রাজারহাটের উত্থানের সঙ্গে এই উপন্যাসের এক ওতপ্রোত সম্পর্ক। আমরা জানি এক একটি নগরায়নের পিছনে থাকে বহু ভূমিপুত্রকন্যাদের ভিটেহারানো অনেক দুঃখের ইতিকথা। উচ্ছেদের সেই কান্নামেশানো আখ্যানের বিস্তৃত রচনা না করে উদ্দিষ্ট উপন্যাসের লেখক ভবানী ঘটক আভাসে ইঙ্গিতে অনেক কথা বলেছেন। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকালীন বাম জমানার অবসানের পটভূমি রচনা হিসেবে উপন্যাসটিকে গণ্য করা যেতে পারে। তবে এতে সেইভাবে আসেনি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের কথা, হয়তো লেখক সেটা আনতেও চাননি। তাঁর এই উপন্যাসটি মূলত আবর্তিত হয়েছে সৌমেন নামের একজন উদ্বাস্তুর হয়ে ওঠার ইতিবৃত্ত হিসেবে।

একাত্তরের শরণার্থী শিবিরে যে শিশুর জন্ম তার বেড়ে ওঠার বৃত্তান্ত যে তেমন সুখপাঠ্য হবে না, সে তো ধরেই নেওয়া যায়। শিশুটির চারপাশের দারিদ্র্যপীড়িত যাপনের বর্ণনা লেখক অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। বস্তুত ক্ষুধা ও অশিক্ষার বাতাবরণে সৌমেন আত্মপ্রতিষ্ঠাকামী এ যুগের একজন ভাগ্যতাড়িত প্রতিনিধি। তাই তাঁর জীবন যাপনে মূল্যবোধ নিরুপণের দোদুল্যমানতা এবং তাকে জয় করে অভীষ্ট লক্ষে পৌঁছানোর এক দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় আমরা দেখতে পাই। ফলে চরিত্রটি এ যুগের নিরিখে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। আর দশটা উদবাস্তু মানুষের মতো মূল্যবোধহীন যাপনে অভ্যস্ত সৌমেন উঠে দাঁড়াতে চায়। তার এই উঠে দাঁড়ানোর সহায়ক হয়ে ওঠে রাজনৈতিক দলতন্ত্রের কিছু অমোঘ রীতিনীতি। কিন্তু তার পরম দুর্ভাগ্য এই যে এই শতাব্দীর প্রথম দশকেই বাম জমানার যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল সৌমেন সেই টালমাটাল সময়ের সন্ধিক্ষণে আরও আরও উপরে ওঠার সিঁড়িতে মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়ায়। অদ্ভুতভাবে সে সময়ের ঘড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়ে একেবারে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে দাঁড়িয়ে রাজনীতির অন্য শিবিরে নাম লেখায়। এই চাতুরী এবং মূল্যবোধহীন প্রতিষ্ঠাকামিতা নীলুর বয়ানে লেখক অতি চমৎকারভাবে বিবৃত করেছেন। সৌমেন যেন আমাদের অতি চেনা এক এ যুগের প্রতিনিধি হয়ে দেখা দেয়। সময়ের দাবি মেনে নিজের মূল্যবোধকে বিসর্জন দিতে তার কোনও কার্পণ্য হয় না। পাঁচ বন্ধুবৃত্তের এই সরল-রৈখিক কাহিনি শেষ পর্যন্ত আর সরল থাকে না। সবাইকে টেক্কা দিয়ে সৌমেন তার অগ্রগতির ছন্দ ঠিকই রক্ষা করে যায়। বিস্ময়ে হতবাক অন্য বন্ধুদের থেকে এইভাবেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সে।

তবে শেষ পর্যন্ত ভাবনী ঘটকের এই ‘দখলদার’ উপন্যাসটি  ব্যক্তিগত পরিসর অতিক্রম করে নগরায়নের এক নির্মম রাজনৈতিক উপাখ্যান হয়ে ওঠে। আসলে ‘বন কেটে বসত’ নির্মাণের যে তথাকথিত সভ্যতার উত্থান, তাতে মিশে থাকে অজস্র উচ্ছেদ আর নির্মম অবিচারের কাহিনি। এই উপন্যাসটিও শেষ পর্যন্ত নতুন একটি জনপদ নির্মাণের এক অশ্রুসিক্ত আখ্যান। লেখকের নিজস্ব ভাষ্য এখানে উল্লেখ আশা করি অবান্তর হবে না।                                                                        
“…আসলে নব্য-উদার অর্থনীতির এ এক নতুন প্ল্যান। আধুনিক বুর্জোয়া তারই মদতে পুষ্ট। উন্নত-অনুন্নত-উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন এরই জালে জড়িয়ে আছে। তাদের এজেন্ট হচ্ছে স্থানীয় সরকারগুলি। ওই নতুন বিশ্বায়িত মুক্ত অর্থনীতির এক বিশেষ পরিকল্পনা–মহানগরীর পরিবর্ধন। যাকে বলে, এক্সটেনশান অফ মেগাসটি…এই প্ল্যান কার্যকর হওয়া শুরু হয়েছে ষাটের দশকে। সল্টলেক ধ্বংস দিয়ে যাত্রা শুরু। বর্তমানে সেটাই পরিণতি লাভ করেছে ‘ব্রাডা’ বা ভাঙড়-রাজারহাট এরিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটি প্রকল্প।’’                                                                                                                              

 লেখকের এই স্পষ্ট উক্তির পরে আমাদের আর দ্বিধা থাকে না এই উপন্যাসটির অভিমুখ সম্পর্কে। নব্য অর্থনীতির যাঁতাকলে ধনতন্ত্রের যে উত্থান শুরু হয়েছে, তাতে সত্যিকারের লাভ হচ্ছে কাদের? লেখক এই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়ে দিয়েছেন - ‘দেশে জেগে ওঠা নতুন ধরনের মধ্যবিত্তরা এর সুবিধা ভোগ করবে। তারা এখন নিয়ন্ত্রক। তারাই সরকার গঠন করছে। মাঝেমধ্যে সরকারের রংটা বদলিয়ে দিচ্ছে। রাজা আসছে যাচ্ছে। রাজার পোষাকটা শুধু বদলাচ্ছে।’

এই বদলানো পোষাকের রাজার অঙ্গুলিহেলনে চলছে এখন দেশটা। এখানে নীলু-নীপার ব্যক্তিগত সমস্যা ছাপিয়ে লুম্পেন ‘সৌমেনে’-এর নৈতিকতা বর্জিত যাপনবৃত্তান্ত বড়ো হয়ে দেখা দিচ্ছে। তাই একজন উদবাস্তু মানুষের উঠে দাঁড়ানো এবং সামনের এগিয়ে যাবার কাহিনি হয়ে ওঠে এই ‘দখলদার’ উপন্যাসটি। সেই দখলদারিত্ব ব্যক্তিগত পরিসর অতিক্রম করে বৃহৎ সমাজের ভাঙনের কথা বলে, ঝাঁ চকচকে উপনগরী নির্মাণের নেপথ্য পটভূমিটুকু কেবল চিনিয়ে দেয়। পরিবর্তিত রাজনীতির খোলস যে কেবলমাত্র একটি ছোট্ট বাধা ছাড়া আর কিছু নয়, যাকে সরিয়ে নতুন করে নতুন জনপদ নতুন মূল্যবোধ তথা নতুন নির্মাণের অগ্রযাত্রাই শেষ কথা, যার মূলমন্ত্র কেবল দখল করা দখল করা এবং দখল করা।
------------ 
*দখলদার * ভবানী ঘটক * পরম্পরা * কলকাতা * ২০২৪ * প্রচ্ছদলিপি – সম্বিত বসু * মূল্য ৩৫০ টাকা *