আজকাল ওয়েবডেস্ক: ঘড়ির কাঁটা যেন এখানে থেমে যায়, সূর্য নামে না মাসের পর মাস। এমনই এক আজব গ্রাম রয়েছে নরওয়ের উত্তর প্রান্তে। নাম সোমারয়। আপাত দৃষ্টিতে এটি পৃথিবীর মানচিত্রে ছোট্ট এক দ্বীপ। নাম-গোত্রহীন, কিন্তু এর জীবনযাত্রা আর নিয়ম এতই ব্যতিক্রমী যে সারা পৃথিবীর আর কোথাও তেমনটা নেই। কারণ? এখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন সময় বলে কিছু নেই। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। সোমারয়ের বাসিন্দারা মনে করেন, সময় তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বরং তাঁরা নিজের ছন্দে চলেন, সূর্যের আলোকে অনুসরণ করেই গড়ে তোলেন তাঁদের দৈনন্দিন যাপন।
আরও পড়ুন: শুক্রাণু দান করে কত টাকা আয় হয়? ভারতে বীর্য দাতা হতে গেলে কোন কোন নিয়ম জানতে হবে?
সোমারয় শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘গ্রীষ্মের দ্বীপ’। এই দ্বীপে প্রতি বছর মে মাস থেকে জুলাই পর্যন্ত সূর্য একবারও অস্ত যায় না। অর্থাৎ দিনের ২৪ ঘণ্টাই আলোকিত থাকে গোটা অঞ্চল। ফলে এই কটা মাস টানা গ্রীষ্ম কাল থাকে। আবার বিপরীত দিকেও আছে চমক। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত টানা কয়েক সপ্তাহ সূর্য একেবারেই ওঠে না। অন্ধকারে ডুবে থাকে চারপাশ। তখন তীব্র ঠান্ডা, একটানা গভীর রাত।
আরও পড়ুন: ৮৫ বছর বয়সে মাধ্যমিকে বসেও ফের অকৃতকার্য! ইনিই পৃথিবীর সবচেয়ে বয়স্ক স্কুলছাত্র
আসলে পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের খুব কাছে অবস্থিত হওয়ার কারণেই এমনটা ঘটে। এই অদ্ভুত প্রাকৃতিক অবস্থান সোমারয়ের মানুষদের সময়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকেই বদলে দিয়েছে। তাঁরা বলেন, “যেখানে রাত আর দিনই নেই, সেখানে ঘড়ির কাঁটা মেনে চলার কোনও মানে হয় না।”
তবে বিষয়টি শুধু দার্শনিক ভাবে নয়, বাস্তবেই যে মেনে চলেন এই গ্রামের বাসিন্দারা তারও প্রমাণ আছে। ২০১৯ সালে সোমারয়ের মানুষ এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ করেন। তাঁরা সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে দাবি জানান যে, সোমারয়কে ‘টাইম-ফ্রি জোন’ বা সময়মুক্ত এলাকা হিসাবে ঘোষণা করা হোক। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ঘড়ির সময় মেনে চলা এই অঞ্চলের জন্য অস্বস্তিকর। যখন রাত ২টোতেও সূর্য আকাশে থাকে, তখন দোকান খোলা বা স্কুলের সময় বেঁধে দেওয়া হাস্যকর মনে হয়। অনেকেই মধ্যরাতে সাঁতার কাটতে যান, কেউ আবার ভোর ৪টেয় মাছ ধরতে যান, সবই সূর্যের আলোর উপর নির্ভর করে। যতক্ষণ আলো ততক্ষণ কাজ। এই দাবির নেপথ্যে ছিল মূলত এক মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। একটি এমন সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান যেখানে সময়ের চাপ নেই, নেই কোনও তাড়াহুড়ো, বরং মানুষ নিজের ছন্দে চলতে পারে।
সোমারয়ের এই ব্যতিক্রমী দাবি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় হইচই ফেলে দেয়। কেউ বলেন, এটি আধুনিক সভ্যতার বিরুদ্ধে এক প্রতীকী প্রতিবাদ, আবার কেউ একে রোমান্টিক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেন। এই দাবি নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়। কারণ, সরকার যদি সোমারয়কে ‘টাইম-ফ্রি জোন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে সেখানে প্রশাসনিক কাজকর্ম, স্কুল, হাসপাতাল, পরিবহন সবকিছু চালানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই মানা হয়নি গ্রামবাসীদের দাবি।
শেষপর্যন্ত সোমারয়কে আইনত ‘টাইম-ফ্রি জোন’ ঘোষণা করা না হলেও, এর ভাবনাটি বিশ্বব্যাপী বহু মানুষের মনে এক নতুন প্রশ্ন তুলে দেয়। সময় বলতে আমরা যা বুঝি তা কি সত্যিই বাস্তব, নাকি একটি সামাজিক নিয়মমাত্র? নরওয়ের সোমারয় গ্রাম তাই শুধুমাত্র একটি ছোট্ট দ্বীপ বা ব্যতিক্রমী জায়গা নয়, এটি এক দার্শনিক অবস্থানও বটে। যেখানে মানুষ সময়ের গোলাম নয়, বরং মানুষই সময়কে নিজের মতো গড়ে নেয়। আধুনিক জীবনের এই ক্লান্তিকর দৌড়ঝাঁপের মধ্যে সোমারয়ের এই ভাবনা যেন এক স্বস্তির নিঃশ্বাস।